সংকটে মিয়ানমার বিমানবাহিনী, সামরিক গ্রেডের বদলে বাণিজ্যিক বিষ্ফোরক দিয়ে বানাচ্ছে বোমা

সংকটে মিয়ানমার বিমানবাহিনী, সামরিক গ্রেডের বদলে বাণিজ্যিক বিষ্ফোরক দিয়ে বানাচ্ছে বোমা

সংকটে মিয়ানমার বিমানবাহিনী, সামরিক গ্রেডের বদলে বাণিজ্যিক বিষ্ফোরক দিয়ে বানাচ্ছে বোমা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জান্তা বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে সম্প্রতি বিমানবাহিনীর ছোড়া বেশ কিছু অবিস্ফোরিত এরিয়াল বোমা ধরা পড়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই বোমাগুলো নিষ্ক্রিয়করণের সময় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য নজরে এসেছে। বোমার মূল চার্জ হিসেবে সচরাচর সামরিক উপাদানের বদলে বাণিজ্যিক গ্রেডের ইমালশন বিস্ফোরক (Emulsion Explosive) ব্যবহার করা হয়েছে।

উদ্ধারকৃত এই বোমাগুলো মূলত ২৫০ কেজির (550 lb) থার্মোবারিক বা ফুয়েল-এয়ার এক্সপ্লোসিভ (FAE), যা যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে ‘ভ্যাকুয়াম বোমা’ নামে পরিচিত। সাধারণত সামরিক বোমায় টিএনটি বা আরডিএক্স ব্যবহৃত হলেও জান্তা বাহিনীর বোমায় খনিতে ব্যবহৃত এই রাসায়নিকের ব্যবহার যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের বড় ধরণের রসদ সংকট এবং নতুন কৌশলগত পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মিয়ানমার জান্তা সরকার বর্তমানে সামরিক গ্রেডের কাঁচামাল ও তৈরি বিস্ফোরক আমদানিতে চরম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে এবং বিমান হামলার খরচ কমাতে তারা জান্তা নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র কারখানাগুলোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে এই ২৫০ কেজির ভ্যাকুয়াম বোমাগুলো তৈরি বা রিফিল করছে।

দেশের খনি অঞ্চলগুলোতে সহজলভ্য বাণিজ্যিক ইমালশন ও অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের সাথে অ্যালুমিনিয়াম পাউডার মিশিয়ে তারা এর বিস্ফোরণ গতি বাড়িয়ে নিচ্ছে। তবে ইমালশন বিস্ফোরক তুলনামূলক শান্ত প্রকৃতির হওয়ায় সাধারণ ডেটোনেটর দিয়ে একে ফাটানো যায় না। এই সমস্যার সমাধানে জান্তা বাহিনী বোমার সিংহভাগ অংশ (প্রায় ৯০%) সস্তা ইমালশন দিয়ে পূর্ণ করলেও, সেটিকে সক্রিয় করার মূল ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করছে অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক প্লাস্টিক বিস্ফোরক C4 বা RDX।

বোমার ভেতরে থাকা এই C4 গুলো প্রথমে বুস্টার চার্জ হিসেবে বিস্ফোরিত হয়ে যে তীব্র চাপ ও শকওয়েভ তৈরি করে, তা ভেতরের পুরো ইমালশনকে সক্রিয় করে একটি ভয়াবহ থার্মোবারিক বিস্ফোরণ ঘটায়। বিমান থেকে ফেলার পর এই বোমাটি আঘাত হানার ঠিক আগে বাতাসে তার রাসায়নিক উপাদান ছড়িয়ে দিয়ে একটি বিশাল মেঘ তৈরি করে। এরপর সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানো হলে তা চারপাশের বাতাস থেকে দ্রুত সমস্ত অক্সিজেন চুষে নেয় এবং একটি বিশাল শূন্যতা (ভ্যাকুয়াম), তীব্র তাপ ও দীর্ঘস্থায়ী শকওয়েভ তৈরি করে।বাঙ্কার, বা ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহীদের দমনে জান্তা বাহিনীকে এটি সস্তায় একটি মারাত্মক ধ্বংসাত্মক বিকল্প এনে দিয়েছে।

তবে এই ধরণের ইমপ্রোভাইজড ভ্যাকুয়াম বোমা নিষ্ক্রিয় করা বিদ্রোহীদের বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডের জন্য সাধারণ সামরিক বোমার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক। সামরিক গ্রেডের C4 বা টিএনটি যেখানে কয়েক দশক গুদামে রাখলেও পুরোপুরি স্থিতিশীল থাকে, সেখানে বাণিজ্যিক ইমালশন বিস্ফোরক দীর্ঘ সময় বোমার ধাতব খোলের ভেতর আটকে থাকলে এর ভেতরের রাসায়নিক উপাদানগুলো আলাদা (Phase Separation) হয়ে চরম অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

ফলে বোমাগুলো সামান্য নাড়াচাড়াতেই বা কেবল ফিউজ খোলার চেষ্টাতেই ফেটে যেতে পারে। একই সাথে আন্তর্জাতিক বোমার ফিউজ চার্ট ও কার্যপদ্ধতি বিদ্রোহীদের জানা থাকলেও, জান্তা বাহিনীর স্থানীয়ভাবে জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা এই হাইব্রিড বোমাগুলোর ফিউজ মেকানিজম আগে থেকে অনুমান করা কঠিন।

সামগ্রিকভাবে, বোমায় ইমালশন ও C4-এর এই ককটেল ব্যবহার প্রমাণ করে যে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে জান্তা বাহিনীর প্রচলিত সামরিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে, তবে সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় বেসামরিক ও বিদ্রোহী এলাকায় তাদের বিমান হামলা দিন দিন আরও নির্বিচার ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *