কৃষকের সার নাফ পেরিয়ে মিয়ানমারে, বিনিময়ে আসছে ইয়াবা-অস্ত্র?
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কৃষকের জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ করা ইউরিয়া সার যাচ্ছে নাফ নদী পেরিয়ে মিয়ানমারে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে একের পর এক অভিযানে বিপুল পরিমাণ সার জব্দের ঘটনায় এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—মিয়ানমারে পাচার হওয়া ইউরিয়া সার বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সার পাচারের সঙ্গে ইয়াবা ও অস্ত্রের আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানের যোগসূত্র থাকার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীন ও নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
উখিয়া থানায় গত দুই মাসে হওয়া ছয়টি মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২৭ জুন থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার ৫০ কেজি ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি টিএসপি ও ডিএপি সারও জব্দ হয়েছে। সবচেয়ে বড় চালানগুলোর একটিতে ১৩ জুলাই পূর্ব ফারির বিল এলাকায় ১১৫ বস্তায় পাঁচ হাজার ৭৫০ কেজি ইউরিয়া উদ্ধার করা হয়। ২৭ জুন আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত এলাকায় ৯০ বস্তা বা চার হাজার ৫০০ কেজি ইউরিয়া, পরদিন কাঁঠালতলা খাল থেকে ১৫ বস্তা বা ৭৫০ কেজি এবং ৩০ জুন ফারির বিল নারকেল বাগান এলাকায় আরও ২০ বস্তা বা এক হাজার কেজি ইউরিয়া জব্দ করা হয়। ১৮ জুলাই গয়ালমারা এলাকার একটি টিনশেড গোডাউন থেকে ৫৫ বস্তায় দুই হাজার ৭৫০ কেজি টিএসপি, ডিএপি ও ইউরিয়া উদ্ধার হয়। ২৭ আগস্ট আঞ্জুমানপাড়া থেকে আরও ছয় বস্তা বা ৩০০ কেজি ইউরিয়া জব্দ করা হয়।
এ ধরনের অভিযান অবশ্য এরপরও থেমে থাকেনি। ৬ সেপ্টেম্বর উখিয়ার মরিচ্যা চেকপোস্ট এলাকায় একটি ট্রাক থেকে ৩০০ বস্তা বা ১৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করে বিজিবি ও উপজেলা কৃষি অফিসের যৌথ দল। ওই ঘটনায় একজনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। আবার ১৩ সেপ্টেম্বর উখিয়া সীমান্তে নাফ নদীর চ্যানেল ব্যবহার করে মিয়ানমারে সার পাচারের সময় ১৫০ কেজি ইউরিয়াসহ এক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে ৬৪ বিজিবি।
সীমান্তের কাছের কৃষকদের অভিযোগ, একদিকে তারা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সীমান্তে বস্তার পর বস্তা সার জব্দ হচ্ছে। উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়ার কৃষক মোক্তার আহমদের ভাষায়, জমির বড় অংশ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। নিজেরা সার পাচ্ছেন না, অথচ সীমান্তে বিজিবি বস্তার পর বস্তা সার ধরছে।
সীমান্তের বিভিন্ন পথ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু বড় চালান নয়, ছোট ছোট পরিমাণেও সার সীমান্তের দিকে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, রাতের অন্ধকার, দুর্গম পথ ও নৌপথ ব্যবহার করে এসব সার সীমান্ত এলাকায় নেওয়ার পর নাফ নদী দিয়ে নৌযানে করে মিয়ানমারের নাইসাদং বাজারের দিকে পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক সময়েও নাফ নদীর চ্যানেল ব্যবহার করে ইউরিয়া পাচারের ঘটনা ধরা পড়েছে।
সার পাচারের সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হিসেবে সামনে এসেছে এর সম্ভাব্য ব্যবহার। উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমানের ভাষ্য, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে যাওয়া ইউরিয়া সারের উপাদান বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। কৃষিতে ব্যবহৃত ইউরিয়ায় সাধারণত প্রায় ৪৬ শতাংশ নাইট্রোজেন থাকে। সাধারণ অবস্থায় ইউরিয়া নিজে বিস্ফোরক নয়; তবে নির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এটি বিস্ফোরক তৈরির পূর্বধাপের উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকাতেও ইউরিয়াকে সম্ভাব্য বিস্ফোরক-প্রিকার্সর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন বলেন, মিয়ানমারে ইউরিয়া সার ব্যবহার করে বোমা তৈরির কথা তিনি শুনেছেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে বিস্ফোরণে আহত হওয়ার কয়েকটি ঘটনার সঙ্গেও এ ধরনের বিস্ফোরকের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা। তবে এ বক্তব্যের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, ইউরিয়া থেকে বিস্ফোরক তৈরির সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া সার দিয়েই মিয়ানমারের কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী বোমা তৈরি করছে—এমন নিশ্চিত তথ্য তাঁর কাছে নেই। মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্ফোরক সংগ্রহের আরও উৎস থাকতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সার মিয়ানমারে যাওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর ভাষ্য, সার, সিমেন্ট, রডসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্য সীমান্তপথে মিয়ানমারে যাওয়ার ঘটনা রয়েছে।
সার পাচারের মামলাগুলোতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের নামও এসেছে। কাঁঠালতলা খাল এলাকার একটি মামলায় পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিবন্ধিত বাসিন্দা বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, স্থানীয় বাংলাদেশি পাচারকারীদের হয়ে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাহক হিসেবে কাজ করছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক বস্তা সার সীমান্তে পৌঁছে দিতে বাহককে প্রায় এক হাজার টাকা এবং নৌকার মাঝিকে বস্তাপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা দেওয়া হয়।
আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে প্রায় ৫০০ মিটার পরপর পর্যবেক্ষণ চৌকি রয়েছে। এরপরও ছোট ছোট চালানে সার সরানোর চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এক বিজিবি সদস্যের ভাষ্য, পাচারকারীরা সীমান্তে পাহারার অবস্থান ও সময়সূচির ওপর নজর রেখে রাতের বেলায় সার সরানোর চেষ্টা করে।
৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সীমিত জনবল নিয়েও পাচার ঠেকাতে বিজিবির অভিযান চলছে। আগের তুলনায় পাচার অনেকটাই কমেছে বলে দাবি করেন তিনি। সীমান্ত সড়ক, কাঁটাতার এবং রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা গেলে পাচার আরও কমিয়ে আনা সম্ভব বলে তাঁর মত।
তবে জব্দ হওয়া সারের উৎস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পালংখালীর সার ডিলার ইব্রাহিম আজাদ ও সেলিমুল্লাহর দাবি, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী কৃষকের তালিকা করে সার দেওয়া হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে চোরাকারবারিরা সার নেওয়ার সুযোগ পায় না।
উখিয়ার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশীষ সরকারের পর্যবেক্ষণ ভিন্ন। তাঁর মতে, জব্দ হওয়া সারের বড় অংশই বাইরে থেকে উখিয়ায় আনা হচ্ছে। কারণ উখিয়ার সরকারি বরাদ্দের পরিমাণের সঙ্গে সীমান্তে জব্দ হওয়া সারের পরিমাণের মিল নেই।
সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর পালংখালীর দুটি স্থান থেকে ৭৭ বস্তা ইউরিয়া জব্দের ঘটনাও এই সন্দেহ আরও জোরালো করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, চট্টগ্রাম থেকে সার কিনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে তা মিয়ানমারে পাচার করছে।
পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিনের দাবি, উখিয়া ও টেকনাফ থেকে বের হওয়ার সময় চেকপোস্টে তল্লাশি থাকলেও বাইরে থেকে এলাকায় ঢোকার সময় যানবাহন তল্লাশিতে ঘাটতি রয়েছে। ফলে অন্য এলাকা থেকে সার এনে সীমান্তে পাচারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাঁর দাবি, উখিয়ার গয়ালমারা এলাকার সোনা মিয়া নামের একজন এই পাচারচক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ১৩ ও ১৮ জুলাইয়ের দুটি মামলাতেও তাঁর নাম এসেছে। তবে এ বিষয়ে সোনা মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সার পাচারের সঙ্গে মাদক ও অস্ত্রের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে। মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান মেজর এমদাদুল ইসলামের মতে, মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষ বাংলাদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র বিক্রি করে থাকতে পারে এবং সেই অর্থের একটি অংশ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে সার কেনা হতে পারে।
অন্যদিকে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমানের ভাষ্য, বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকির সার মিয়ানমারে যাওয়ার বিনিময়ে দেশে ইয়াবা আসছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, একই নেটওয়ার্ক সার নিয়ে যাওয়া এবং মাদক নিয়ে ফেরার কাজে যুক্ত থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে সার পাচারের চিত্র এখন শুধু কৃষি উপকরণ চোরাচালানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়; এর সঙ্গে মাদক, অস্ত্র এবং সম্ভাব্য বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ সরবরাহের অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। কৃষকের জন্য বরাদ্দ ভর্তুকির সার যদি সত্যিই সীমান্তপথে পাচার হয়ে থাকে, তাহলে তা একদিকে স্থানীয় কৃষকের সারপ্রাপ্তিকে প্রভাবিত করছে, অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। তবে সার পাচার, ইয়াবা-অস্ত্রের বিনিময় এবং মিয়ানমারে বিস্ফোরক তৈরিতে বাংলাদেশি ইউরিয়া ব্যবহারের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রের বিষয়ে আরও তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।