সাক্ষী নেই, এগোয় না বিচার: রামুতে ১৪ বছর ধরে ঝুলছে ১৮ মামলা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধপল্লীতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের প্রায় ১৪ বছর হতে চলেছে। এসব ঘটনায় ১৯টি মামলা হলেও একটি মামলা প্রত্যাহারের পর বর্তমানে ১৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সাক্ষীদের অনুপস্থিতি ও অনীহার কারণে দীর্ঘ সময়েও মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোয়নি। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও ১৮টি মামলা বিচারাধীন এবং কোনো মামলায় চূড়ান্ত রায় না হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলে থাকায় অভিযুক্তদের অনেকে জামিনে রয়েছেন। কারও কারও বিদেশে চলে যাওয়ার তথ্যও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আলোচিত রামু ট্র্যাজেডির বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কারণে মামলার মূল বিষয়টি যথাযথভাবে সামনে আসেনি এবং বিচার প্রক্রিয়াও ধীরগতির হয়েছে। তারা মামলাগুলো পুনঃতদন্ত করে প্রকৃতভাবে জড়িতদের শনাক্ত এবং দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ফোরামের সদস্যসচিব মিথুন বড়ুয়া বোথাম বলেন, ১৪ বছরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিহারগুলো পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধনও আবার মজবুত হয়েছে। কিন্তু হৃদয়ের গোপন রক্তক্ষরণ এখনও থামেনি। মামলাগুলো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় ঘটনার মূল কারণ উদঘাটন হয়নি। দায়ীদের অনেকে বাদ পড়েছেন। আমরা এখনও শঙ্কামুক্ত নই। বিচারহীনতায় দোষীরা শাস্তির বদলে বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। হামলায় জড়িতদের ছবি ও ভিডিও দেখে এসব মামলা পুনঃতদন্তের দাবি জানাচ্ছি।
রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া বলেন, ২০১২ সালের এ হামলায় জড়িতরা কোনো ধর্মের হতে পারে না। মামলার বিচার না হওয়ায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মনের দাগ এখনও মুছে যায়নি। বিগত সরকার এ ঘটনার বিচার শেষ করতে পারেনি। বর্তমান সরকারও সময় পার করছে, কিন্তু কোনো আশার আলো দেখছি না। মূল অপরাধীদের শনাক্ত করে পুনঃতদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছি।”
রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান ও কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, সাক্ষীর অভাবে বিচার কার্যক্রম ধীরগতির হয়েছে। মামলাগুলো বর্তমানে কোন অবস্থায় রয়েছে, সে বিষয়ে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তদের নারকীয় সেই হামলা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দোষীদের শাস্তি না হলে তারা আবারও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে পারে। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত একটি মামলারও বিচার হয়নি এটি বড় হতাশাজনক।
এদিকে মামলাগুলোর চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন বলে জানিয়েছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি আইনজীবী (পিপি) সিরাজুল ইসলাম মুঠোফোনে তিনি বলেন, বৌদ্ধপল্লী ট্র্যাজেডির ১৮টি মামলা বিভিন্ন আদালতে ভাগ হয়ে চলছে। কোন মামলার কী অবস্থা, তা সংশ্লিষ্ট আদালতের আইন কর্মকর্তা ও কোর্ট ইন্সপেক্টররা জানতে পারেন।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ইউনুস বলেন, মামলাগুলোর মধ্যে চারটি মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। ১৫টি মামলা চলমান রয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণের প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। কয়েকটি মামলায় সাত থেকে ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে এবং অন্যান্য মামলাতেও সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
সূত্রমতে, বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়ের করা স্পর্শকাতর ও আলোচিত মামলাগুলোতে বিপুলসংখ্যক আসামি ও সাক্ষী রয়েছেন। বিভিন্ন আদালতে মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম চললেও সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে তা ধীরগতির হয়েছে। সাক্ষীদের নামে সমন জারি করা হলেও অনেকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এর মধ্যে কয়েকটি মামলা পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে রয়েছে।
রামুর বাসিন্দা সাজু বড়ুয়া বলেন,বৌদ্ধপল্লী ট্র্যাজেডির ঘটনায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের পরিবর্তে মামলার বাদী হয়েছে পুলিশ, তদন্তও করেছে পুলিশ। এতে ইচ্ছেমতো আসামি করা হয়েছে এবং অভিযোগপত্র থেকে অনেকে বাদও পড়েছেন। ন্যক্কারজনক এ ঘটনা কেন ঘটেছিল, এর নেপথ্য কারণ এত বছরেও উন্মোচিত হয়নি। সেদিন হামলায় চেনা-অচেনা অনেকেই অংশ নিয়েছিল। বিভিন্ন স্থিরচিত্র, ভিডিও ফুটেজ ও তদন্ত প্রতিবেদনেও তার প্রমাণ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। কিন্তু প্রকৃত আসামিদের অনেকেই আড়ালে রয়ে গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হামলার পর এলাকায় সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ফের ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হয়েছে। পুড়ে যাওয়া বিহারগুলোও দৃষ্টিনন্দনভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন করে সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেক সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন বলে তাদের দাবি।
রামু উপজেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি রিটন বড়ুয়া বলেন, হামলার ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে, তাদের অনেকেই অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়েছেন। আবার হামলায় জড়িত নন এমন অনেকে আসামি হয়েছেন। তাই সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। সাক্ষীরা পরিবার নিয়ে বসবাস করেন; তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে আজ ২৯ সেপ্টেম্বর দিনটিকে ঘিরে ‘বুড্ডিস্ট সোশ্যাল মুভমেন্ট’-এর আয়োজনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৬টায় বুদ্ধ উপাসনা ও পতাকা উত্তোলন, অষ্টশীল গ্রহণ, চিত্রাঙ্কন এবং চিত্র, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী। অন্যান্য বছর র্যালি অনুষ্ঠিত হলেও এ বছর র্যালি বের করা হবে না বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবক পবিত্র কোরআন অবমাননা করেছেন এমন গুজবের জেরে রাতে রামুর ১২টি বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধপল্লীর ২৬টি ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হামলা চালানো হয়। পরদিন উখিয়া ও টেকনাফেও বৌদ্ধবিহারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
২০১২ সালের ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ফেসবুকের ওই পোস্টকে পরে ভুয়া/ফটোশপ করা ছবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাগুলোতে বিপুলসংখ্যক আসামি করা হয়। পরে একটি মামলা প্রত্যাহার হলেও ১৮টি মামলা বিচারাধীন থাকে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে এসব ১৮ মামলায় ৯৯৩ আসামির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ঘটনার পর থেকে উত্তম বড়ুয়া নামের ওই যুবকেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। উত্তমের বাবা সুদত্ত বড়ুয়া ও মা মাধু বড়ুয়া জানেন না, ঘটনার পর থেকে তাদের ছেলে কোথায় আছেন। ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। উত্তম বড়ুয়ার নিখোঁজ থাকার বিষয়টি নিয়ে ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনেও একই তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, “এটি একটি পরিকল্পিত হামলা ছিল। বিএনপি ও জামায়াতকে দোষারোপ করার জন্য তৎকালীন সরকার এ হামলা পরিকল্পিতভাবে করেছিল বলে আমরা মনে করি। পরে ছবি ও ভিডিও দেখে এ বিষয়ে প্রমাণ পেয়েছি। সেখানে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন ছিল বলেও আমরা ছবি-ভিডিও থেকে প্রমাণ পেয়েছি। তাই অবশ্যই এর বিচার হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।