সন্ত্রাস ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনের পথ বেছে নিল কেএনএফ সদস্য ১৭ বছরের কিশোর, সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ
ছবি- সাউথইস্ট এশিয়া জার্নাল।
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
মাত্র ১৭ বছর বয়স। জীবন গড়ার বয়সেই সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার পথে জড়িয়ে পড়েছিল রোয়াংছড়ির বম সম্প্রদায়ের কিশোর ব্লেসিং রাম হুন ঙাক বম। তবে দীর্ঘ সময় পর নিজ এলাকায় ফিরে এসে সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ নিয়েছে সে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রোয়াংছড়ি উপজেলার রামথার পাড়ার বাসিন্দা ব্লেসিং রাম হুন ঙাক বম (১৭) আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে স্থানীয় এক কারবারীকে সঙ্গে নিয়ে রুমা উপজেলার দেবতা পাহাড়ের একটি সেনা ক্যাম্পে উপস্থিত হন। পরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে রুমা জোন সদরে পাঠানো হয়।
জানা যায়, এদিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দেবতা পাহাড় সেনা ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর দায়িত্বরত সেনা সদস্যরা তার কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জেনে নেন। পরে সকাল ১০টার দিকে তাকে রুমা জোনে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেনাবাহিনীর রুমা জোন অধিনায়ক ব্লেসিং রাম হুন ঙাক বম-এর সঙ্গে কথা বলেন এবং তার অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় ব্লেসিং ভবিষ্যতে এ ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আর জড়িত না হওয়ার এবং সেনাবাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে স্বাগত জানানো হয়।
সূত্র অনুযায়ী, ব্লেসিং রাম হুন ঙাক বম ২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি কেএনএফের তৎকালীন সশস্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্র সিলোপি পাড়ায় যোগ দিয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। পরে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে সে কিছুদিন চট্টগ্রামে অবস্থান করে। পরবর্তীতে সশস্ত্র জীবন নয় বরং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে রামথার পাড়ায় ফিরে আসে। এর পরদিনই অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে সেনাবাহিনীর দেবতা পাহাড় টিওবিতে গিয়ে সে সবকিছু ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, জন্মগতভাবে শিশু বয়সেই থাকা ব্লেসিংকে ভুল বুঝিয়ে কেএনএফের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। তার জন্ম ২৩ জানুয়ারি ২০০৯ সালে। ফলে মাত্র ১২ বছর বয়সে সে কেএনএফের সশস্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যাওয়ার সময় আইনগত ও সামাজিকভাবে একজন শিশুই ছিল। কৈশোরের শুরুতেই এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে জড়িয়ে পড়ার পর একটা সময় কেএনএফের উদ্দেশ্যে বুঝতে পেরে সে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্লেসিং রাম হুন ঙাক বম কেএনএফের সঙ্গে জড়িত থাকা অন্যান্য সশস্ত্র সদস্যদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের পথ কোনো তরুণের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না; বরং পরিবার, সমাজ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার মধ্যেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ রয়েছে। সে নিজে যেভাবে প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে নিজ এলাকায় ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে অন্যদেরও সশস্ত্র পথ ছেড়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ের দুর্গম এলাকার শিশু-কিশোরদের অনেকেই না বুঝে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কথিত অধিকার আদায়ের প্রলোভনে পড়ে স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে অস্ত্র-সন্ত্রাসের পথে চলে যায়। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব, সচেতনতার অভাব, ভুল তথ্য বা প্রলোভনের মতো বিষয় তাদের বিপথে ঠেলে দেয়। ব্লেসিংয়ের ঘটনাটি সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
ব্লেসিংয়ের ক্ষেত্রে সময়মত বিবেকের তাড়না ও পরবর্তীতে প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। চট্টগ্রামে পালিয়ে যাওয়া ও পরে নিজ এলাকায় ফিরে এসে সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেওয়ায় আবারও স্বাভাবিক জীবনে থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে শুধু আইনগত ব্যবস্থা নয়, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেলে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাওয়া তরুণদের পুনর্বাসনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ব্লেসিং রাম হুন ঙাক বমের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কাছে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তার স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরার ঘটনাটি সেই সুযোগেরই একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পর নিজ পাড়ায় ফিরে যাওয়া এই কিশোর এখন পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
দুর্গম পাহাড়ের একটি কিশোরের জীবন কীভাবে ঝুঁকির মুখে চলে যেতে পারে এবং সেখান থেকে কীভাবে আবার স্বাভাবিক জীবনের পথে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে, ব্লেসিংয়ের ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যাওয়া থেকে ফিরে আসা, শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার জীবনের একটি ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়ের আপাতত সমাপ্তি ঘটেছে।
উল্লেখ্য, ব্লেসিংয়ের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়; কেএনএফের সশস্ত্র তৎপরতা, স্থানীয় বম পাড়ার মানুষদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার-নির্যাতনের কারনে নিজ এলাকা ছেড়ে মিজোরামে চলে যাওয়া বম পরিবারগুলোকে নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে নিজ পাড়ায় ফিরিয়ে আনতেও সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে কাজ করে আসছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ, ফিরে আসতে আগ্রহী পরিবারগুলোকে নিরাপত্তার আশ্বাস এবং নিজ নিজ পাড়ায় পুনর্বাসনের উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক পরিবারকে ধীরে ধীরে এলাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফিরে আসা পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে শুধু তাদের পাড়ায় ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি সেনাবাহিনী; প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যসহ ত্রাণসামগ্রী, আর্থিক অনুদান, ঘরবাড়ি নির্মাণ ও মেরামতে সহায়তা, শিক্ষা এবং জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরির মতো বিভিন্ন সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি জনপদে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো, স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সহায়তার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ফিরে আসা পরিবারগুলোর সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা, স্থানীয়ভাবে শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নতুন প্রজন্মকে নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ, বম অধ্যুষিত এলাকায় পর্যটকদের জন্য রিসোর্ট নির্মান, যাতায়াতের সুবিধার্থে যানবাহনের ব্যবস্থা ইত্যাদি উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে সশস্ত্র সংঘাতের কারণে যারা একসময় নিজভূমি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের অনেকের জন্য আবার নিজ পাড়া, পরিবার, শিক্ষা ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের পাশে থেকে ত্রাণ, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার এই ধারাবাহিকতা সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, অস্ত্র ও সংঘাতের পরিবর্তে স্বাভাবিক জীবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করাই পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে, আর সেই লক্ষ্যেই সেনাবাহিনীর মানবিক ও পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।