চাহিদা বাড়লেও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়েনি ডাবের উৎপাদন

চাহিদা বাড়লেও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়েনি ডাবের উৎপাদন

চাহিদা বাড়লেও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়েনি ডাবের উৎপাদন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

তারেকুর রহমান, কক্সবাজার

কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শিলখালীতে রফিকুল ইসলামের নারিকেলবাগান একসময় বেশ সতেজ ছিল। ১২০ শতক জমির অর্ধ শতাধিক গাছে ঝুলত ডাব। বাগানের ফলন ছিল পরিবারের বাড়তি আয়ের একটি উৎস। কিন্তু গত ছয় থেকে আট বছরে কয়েক দফা বন্যা ও সাগরের অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ঢুকে বদলে গেছে বাগানের চিত্র। পানির তোড়ে গাছের গোড়ার মাটি সরে শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধীরে ধীরে গাছ চিকন হয়ে কমেছে ডাবের ফলনও।
উখিয়ার সোনারপাড়ার আব্দুল মাজেদও ৭৫ শতক জমিতে চাষ করা ডাবের আগের মতো ফলন পাচ্ছেন না প্রায় ১০ বছর ধরে। ঘূর্ণিঝড় ও প্রবল বাতাসে গাছগুলো হেলে গেছে, কমেছে ফলন। ফলে সৈকতে ডাব বিক্রি করে আগের মতো লাভও হচ্ছে না।
রফিকুল ও মাজেদের মতো কক্সবাজারের উপকূলের অনেক নারিকেলচাষিই একই সমস্যায় পড়েছেন। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, সাগরের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার পরিবর্তন ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাস নারিকেলগাছের বৃদ্ধি ও ফলনে প্রভাব ফেলছে। কোথাও শিকড়ের মাটি সরে যাচ্ছে, কোথাও লবণাক্ততায় দুর্বল হচ্ছে গাছ। দীর্ঘ খরা ও অতিরিক্ত তাপেও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ডাব ধরার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
তবে উৎপাদন বাড়াতে পুরোনো গাছের পাশাপাশি নতুন চারা রোপণ, গাছের বয়স অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ, প্রয়োজনমতো সেচ ও পানি নিষ্কাশন এবং লবণসহিষ্ণু জাত নির্বাচন জরুরি। পাশাপাশি রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে উপকূলে ডাবের ফলন বাড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
কয়েক উপজেলায় উৎপাদন স্থির
কক্সবাজারের প্রধান উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন অর্থবছরে উখিয়ায় ডাবের উৎপাদন সামান্য বাড়লেও টেকনাফ, সদর, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
উখিয়ায় ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১৪০ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ১০৩ মেট্রিক টন ডাব উৎপাদন হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১৩৮ হেক্টরে উৎপাদন হয় ১ হাজার ১০৫ মেট্রিক টন এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১৪০ হেক্টরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২০ মেট্রিক টনে।
অন্যদিকে, টেকনাফে তিন অর্থবছরেই ২৫৬ হেক্টর জমিতে আবাদ হলেও ২০২৩–২৪ ও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ৪ হাজার ৮০৫ মেট্রিক টনে নেমেছে। কক্সবাজার সদরে তিন বছরেই ২৪ হেক্টরে ৬০০ মেট্রিক টন, মহেশখালীতে ৫০ হেক্টরে ৪২৫ মেট্রিক টন এবং কুতুবদিয়ায় ৮ হেক্টরে ৮০ মেট্রিক টন উৎপাদনের তথ্য অপরিবর্তিত রয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চকরিয়ায় ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৯০ হেক্টরে ১ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন উৎপাদন হলেও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে ১০০ হেক্টর এবং উৎপাদন ২ হাজার ৬০৫ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। চলতি অর্থবছরে আবাদ বেড়ে ১০৫ হেক্টর এবং উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন। পেকুয়ায় একই সময়ে আবাদ ৫০ থেকে ৫৫ হেক্টরে বেড়েছে; উৎপাদন ১ হাজার ২৫ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৬ এবং চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ১৬৫ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।
চাহিদা বাড়লেও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়েনি ডাবের উৎপাদন
রামুতে তিন অর্থবছরেই ১৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেল আবাদ এবং ৩ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন উৎপাদনের তথ্য রয়েছে।
অর্থাৎ চকরিয়া ও পেকুয়ার মতো কয়েকটি উপজেলায় আবাদি জমি ও উৎপাদন বাড়লেও উপকূলীয় অন্যান্য উপজেলায় আবাদ প্রায় স্থির। কোথাও উৎপাদনও অপরিবর্তিত, আবার টেকনাফে একই পরিমাণ জমিতে চলতি অর্থবছরে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
পুরোনো গাছ, কমছে ফলন
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পুরোনো গাছের পরিচর্যার অভাব এবং নতুন করে নারিকেলগাছ না লাগানোর কারণে ধীরে ধীরে উৎপাদন কমছে।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, টেকনাফে ২৫৬ হেক্টর জমিতে ৬ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন নারিকেল বা ডাব উৎপাদন হলেও ফলন তুলনামূলক কম। এর অন্যতম কারণ অধিকাংশ গাছের বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের বেশি। এসব গাছ প্রায় ৫০ ফুট উঁচু হওয়ায় কীটনাশক স্প্রে করাও কঠিন। পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপমাত্রায় নারিকেলের ফুল ঝরে যাওয়ায় ফলন কমে।
তিনি বলেন, একটি নারিকেলগাছে ফল আসতে ১০ থেকে ১২ বছর লাগে। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত ভালো ফলন পাওয়া গেলেও ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সের পর ফলন কমতে শুরু করে। তাই পুরোনো গাছের পাশাপাশি নতুন চারা রোপণ প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবির আরও বলেন, অনেক কৃষক মনে করেন নারিকেলগাছে সার প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। এ ধারণা সঠিক নয়। গাছের বয়স অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ ও নিয়মিত পরিচর্যার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পুরোনো বাগানে নতুন চারা লাগাতেও বলা হচ্ছে। এ বছর টেকনাফে কৃষক ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫ হাজার ৫৫০টি নারিকেলের চারা বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষকের নতুন উদ্যোগ 
ক্ষতি মেনে বসে নেই রফিকুল ইসলাম। কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে পুরোনো গাছের পরিচর্যার পাশাপাশি নতুন নারিকেলগাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে আমাদের বাগানে ভালো ডাব হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে বন্যার পানি ও সাগরের লবণাক্ত পানি ঢুকে গাছগুলোর অনেক ক্ষতি হয়েছে। গাছের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর থেকে ডাবের ফলন কমে গেছে, গাছগুলোও চিকন হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন কৃষি অফিসের পরামর্শ নিচ্ছি। পুরোনো গাছগুলোর পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছি। উপকূলের জন্য লবণ সহিষ্ণু জাতের চারা এবং সঠিক পরিচর্যা করে আবহাওয়া জনিত ক্ষতি কমানোর পরামর্শ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। নতুন গাছগুলো ভালোভাবে বড় করতে পারলে ভবিষ্যতে ফলন আবার বাড়বে বলে আশা করছি।’
সদরের খুরুশকুল এলাকার নুরুল আবছার বলেন, ‘আগে একটি গাছ থেকে যে পরিমাণ ডাব পাওয়া যেত, এখন তা পাওয়া যায় না। প্রচণ্ড গরম ও বৃষ্টির অনিয়মে গাছ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পানি জমে থাকে। কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে এখন নিয়মিত ইউরিয়া, টিএসপি সার ও পানি দেওয়ার চেষ্টা করছি। পুরোনো গাছের পাশাপাশি নতুন চারা লাগানোরও উদ্যোগ নিয়েছি।’
রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির বাগান মালিক এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা নেই, কিন্তু গরম অনেক বেড়েছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে গাছে পানি দিতে হয়। আবার ঝড় হলে কচি ডাব ও ফুল ঝরে যায়। আগে এসব সমস্যা এত বেশি ছিল না। এখন নিয়মিত পরিচর্যা না করলে ফলন ধরে রাখা কঠিন। তাই নতুন পরিকল্পনায় ডাবের ফলন বাড়ানোর উপায় জেনে এগিয়ে যাচ্ছি।’
উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন পরিচর্যা 
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাবের উৎপাদন ধরে রাখতে সুষম সার প্রয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ, পানি নিষ্কাশন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং পুরোনো গাছের পাশাপাশি নিয়মিত নতুন চারা রোপণ করতে হবে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী বাগানের পরিচর্যা করতে হবে।
টেকনাফের শামলাপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক উদ্দিন বলেন, প্রতিটি নারিকেলগাছে বছরে অন্তত দুইবার সুষম সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। গাছের বয়স অনুযায়ী সারের পরিমাণ কম-বেশি করতে হবে। ১০ বছরের কম বয়সী গাছে গোড়া থেকে দুই-তিন হাত দূরে নালা তৈরি করে পচা গোবর, ডিএপি, এমওপি ও জিপসাম প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রথম কিস্তি এপ্রিল-মে এবং দ্বিতীয় কিস্তি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দিতে হবে। ১০ বছরের বেশি বয়সী গাছে বয়স অনুযায়ী সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে নিকটস্থ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগের পরামর্শও দেন তিনি।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় মোট ৭৮৮ হেক্টর জমিতে নারিকেল বা ডাবের আবাদ রয়েছে। এসব বাগান থেকে বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৯৮০ মেট্রিক টন ডাব উৎপাদন হচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, বাড়ছে দাম 
উৎপাদন ও স্থানীয় সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারেও। বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি ডাব ১৭০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক বছর আগে একই ধরনের ডাবের দাম ছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট এলাকার ডাব ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আগে স্থানীয় বাগান থেকেই অনেক ডাব পাওয়া যেত। এখন স্থানীয়ভাবে সরবরাহ কমে গেছে। তাই বাইরে থেকে ডাব আনতে হচ্ছে। পরিবহন খরচসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারেও দাম বেশি পড়ছে।’
আরেক ব্যবসায়ী আরাফাত বলেন, ‘গরমের সময় ও পর্যটন মৌসুমে ডাবের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তখন স্থানীয় ডাব দিয়ে চাহিদা মেটানো যায় না। বাইরে থেকে ডাব আনতে হয়। সরবরাহ কম থাকলে দামও বেড়ে যায়।’
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, ‘গরমের মৌসুম, পর্যটন মৌসুম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় ডাবের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে রোগীদের ডাবের পানি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় হাসপাতাল ও রোগীর স্বজনদের মধ্যেও চাহিদা থাকে। ফলে সংকট তৈরি হয়। এ অবস্থায় অসাধু পন্থা অবলম্বন করে ডাবের দাম অতিরিক্ত নেওয়া অনুচিত।’
  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *