আলীকদমে প্রেসক্লাব সভাপতির বিরুদ্ধে দখল, দুর্নীতি, মাদক–মানবপাচার ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ
![]()
বান্দরবান প্রতিনিধি
বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ মনতাজ উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদক ও মানবপাচার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ। অভিযোগের প্রতিবাদে গত ১১ জানুয়ারি ২০২৬ আলীকদম বাজারস্থ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে প্রেসক্লাব ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন সাংবাদিকরা।
২৭ বছর ধরে প্রেসক্লাব ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, মোঃ মনতাজ উদ্দিন আহমদ ১৯৯৮ সাল থেকে কোনো নির্বাচন, সাধারণ সভা বা সদস্য অন্তর্ভুক্তি ছাড়াই আলীকদম উপজেলা প্রেসক্লাবকে একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে প্রেসক্লাবকে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ভয়ভীতি নির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন, যা সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও সংগঠনের গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী।

সরকারি অনুদান ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রেসক্লাবের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে প্রাপ্ত অনুদান ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একইভাবে আলীকদম আজাদ স্মৃতি পাঠাগারের সভাপতির দায়িত্বে থেকেও সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা দপ্তরের অনুদান সংক্রান্ত আংশিক তথ্য এতে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বান্দরবানে আলীকদমে যৌথ অভিযানে ৪ হাজার ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক
মাদক ও মানবপাচার চক্রের ‘নেপথ্য পৃষ্ঠপোষক’?
অভিযোগে বলা হয়, মোঃ মনতাজ উদ্দিন নিজে আড়ালে থেকে তার ভাইদের মাধ্যমে ইয়াবা পাচার, মানবপাচার ও অবৈধ পাথর উত্তোলনের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তার ভাই নজরুল ও রুহুলের বিরুদ্ধে আলীকদম থানায় একাধিক মানবপাচার ও মাদক মামলার তথ্য রয়েছে। যদিও তারা একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন, তবে অবৈধ অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিজের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা
শুধু ভাইদের নয়, প্রেসক্লাব সভাপতির বিরুদ্ধেও আলীকদম থানায় চুরি, মারামারি ও শ্লীলতাহানির মামলা চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে পরে তাকে ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে মোবাইল চুরি করেন তিনি। এ ঘটনায় ইউএনও নিজে বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে চুরির মামলা দায়ের করেন।

ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নির্বাচন বিতর্ক
মোঃ মনতাজ উদ্দিন ১৯৯৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও ভুয়া আলিম ও ফাজিল সনদ তৈরি করে ২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনী হলফনামায় নিজেকে গ্রাজুয়েট হিসেবে উল্লেখ করেন, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘরবাড়ি দখল ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি আলীকদম সরকারি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকাকে কেন্দ্র করে শফিক মাস্টারের ঘরবাড়ি দখল করেন এবং পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করান। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং আলীকদমে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

সাংবাদিক নির্যাতন, অপহরণ ও ভয়ভীতি
মাতামুহুরী রিজার্ভ এলাকায় অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিক সুশান্তের হাত ভেঙে দেওয়া ও অপহরণের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে কথা বললেই সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া হয় এবং মাদক বা অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখানো হয়। এক সাংবাদিক হাসানকে এভাবে র্যাবের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।

প্রেসক্লাব ‘পরিবারতন্ত্রে’ রূপ নিচ্ছে?
বর্তমানে আলীকদম প্রেসক্লাবের কার্যক্রম মূলত মনতাজ উদ্দিন ও তার ভাই শাহ আলম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ সম্পাদক জুয়েল উদ্দিন প্রতিবাদস্বরূপ পদত্যাগ করেছেন। একাধিক সদস্য সরকারি চাকরি বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে সক্রিয় সাংবাদিকতায় নেই। ফলে প্রেসক্লাবটি কার্যত পরিবারতন্ত্রে রূপ নিচ্ছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ।
মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও তালাবদ্ধ প্রেসক্লাব
১১ জানুয়ারি বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে দৈনিক যুগান্তর, কালবেলা, কালেরকণ্ঠ, জনকণ্ঠসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা প্রেসক্লাবের পুরোনো কমিটি বাতিল, আর্থিক অনিয়মের তদন্ত এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানান। মানববন্ধন শেষে প্রেসক্লাবের গেইটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
আলীকদম প্রেসক্লাব সভাপতির বিরুদ্ধে অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগে মানববন্ধন, প্রেসক্লাবে তালা
আলীকদম প্রেসক্লাব সভাপতির বিরুদ্ধে অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগে মানববন্ধন, প্রেসক্লাবে তালা
পরে আলীকদম জোনের একটি সেনা টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে সাংবাদিকরা তাদের কাছে প্রেসক্লাব সভাপতির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে মৌখিকভাবে অবহিত করেন এবং একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।
সাংবাদিকদের ভাষ্য, আলীকদম উপজেলা প্রেসক্লাব আর পেশাজীবী সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। অবিলম্বে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব গঠন না হলে সাংবাদিকতার মতো মহৎ পেশা আরও কলঙ্কিত হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।