পাকিস্তানের বিপুল খনিজে নজর যুক্তরাষ্ট্রের, পথের কাঁটা তাদেরই ফেলে আসা অস্ত্র
![]()
নিউজ ডেস্ক
আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে পাকিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালার দুর্গম এলাকা। সেখানে একটি পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক খনি। শীতের রোদে সেই খনি চকচক করছে। নাম মুহাম্মদ খেল কপার মাইন।
গত বছর এই বা তামার খনি থেকে ২২ হাজার টন তামা তোলা হয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েকশ মিলিয়ন ডলার। এসব তামা চলে গেছে চীনে। ধাতু ও খনিজ সম্পদের প্রতি চীনের ক্ষুধা যেন কিছুতেই মেটার নয়।
পাকিস্তানের পাশের আরেকটি প্রদেশে রয়েছে আরও বড় একটি তামার খনি। পাকিস্তানের দাবি, সেখান থেকে মুহাম্মদ খেলের চেয়েও দশ গুণ বেশি তামা পাওয়া সম্ভব। আমেরিকা বছরে যে পরিমাণ তামা ব্যবহার করে, এই এক খনিতেই তার এক-পঞ্চমাংশ পাওয়া যেতে পারে।
এই খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা এতটাই উজ্জ্বল যে ওয়াশিংটনও এর ভাগ নিতে চায়। এ কারণেই কাজ এগিয়ে নিতে তারা ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
পাকিস্তান বলছে, তাদের মাটির নিচে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের তামা, লিথিয়াম, কোবাল্ট, সোনা ও অ্যান্টিমনিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ রয়েছে। এই বিপুল সম্পদের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের এক অপ্রত্যাশিত সখ্য গড়ে উঠেছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে খনিজ সম্পদ আহরণকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে পাকিস্তানের এই ‘গুপ্তধন’ বা খনিজ ভাণ্ডারগুলো অবস্থিত সীমান্ত সংলগ্ন এমন সব এলাকায়, যা গত কয়েক দশক ধরে জিহাদি ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলে। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে বিশৃঙ্খলা আরও বেড়েছে। তাড়াহুড়ো করে আফগানিস্তান ছাড়ার সময় আমেরিকা বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ফেলে গিয়েছিল। সেই অস্ত্র এখন জঙ্গিদের হাতে।
সম্প্রতি সিএনএনের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের ওই দুর্গম ও বিপজ্জনক এলাকাগুলোতে গিয়েছিল। সেখানে তারা জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা শত শত মার্কিন রাইফেল, মেশিনগান ও স্নাইপার রাইফেল দেখতে পায়। এগুলো একসময় আফগানিস্তানে ব্যবহার করত মার্কিন সেনারা।
মুহাম্মদ খেল তামার খনি থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে ওয়ানা শহর। সেখানকার একটি ক্যাডেট কলেজে কিছুদিন আগেই পাকিস্তানি তালেবান আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল। সেখানকার এক কর্নেল জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা তিনটি এম-১৬ রাইফেল দেখান। রাইফেলগুলোর গায়ে স্পষ্টভাবে লেখা—’প্রপার্টি অব ইউএস গভর্নমেন্ট’ (মার্কিন সরকারের সম্পত্তি)। সঙ্গে লেখা, ‘ম্যানুফ্যাকচারড ইন কলম্বিয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা’।
আমেরিকার ফেলে যাওয়া এসব উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্র এখন সীমান্ত এলাকায় জঙ্গিদের শক্তি বাড়াচ্ছে, আর এটাই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, মাটির নিচের এই বিপুল খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা এখন আমেরিকারই ফেলে যাওয়া এই অস্ত্রভাণ্ডার।
আইফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি—আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সবকিছুর প্রাণভোমরা হলো ‘রেয়ার আর্থ’, বিরল সব খনিজ উপাদান। বিশ্বের পরিশোধিত এই বিরল খনিজের ৯০ শতাংশেরও বেশি এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে বেইজিংয়ের হাতে সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস খনিজ সম্পদের ওপর এই একচেটিয়া আধিপত্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের এই দাপট ভাঙতে মরিয়া। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম বছরেই তিনি অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে খনিজ সম্পদ আহরণ নিশ্চিত করতে চুক্তি সই করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যা প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি খনিজ তিনি নিশ্চিত করবেন।
বাতাসের এই গতি বুঝতে ভুল করেনি পাকিস্তান। গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির যখন হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে যান, সঙ্গে নেন এক অভিনব উপহার। সেটি ছিল পাকিস্তানের মাটি থেকে তোলা বিরল খনিজে ঠাসা একটি সিন্দুক।
উপহারটি ট্রাম্পের মন জয় করে নেয়। এর পরের মাসেই তিনি প্রকাশ্যে অসীম মুনিরের প্রশংসা করেন। এমনকি তাঁকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলেও সম্বোধন করেন।
শুধু বিরল খনিজই নয়, পাকিস্তানের বিপুল তামার ভাণ্ডার নিয়েও ট্রাম্পকে আগ্রহী করে তুলেছে ইসলামাবাদ। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সেমিকন্ডাক্টরের জন্য তামা অপরিহার্য।
বিশ্বজুড়ে এখন ডিজিটালাইজেশন ও বিদ্যুতায়নের জোয়ার চলছে। ফলে শুরু হয়েছে তামা সংগ্রহের ধুম। বর্তমানে বছরে তামার চাহিদা ৩ কোটি টন, যা ২০৫০ সাল নাগাদ ৫ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস সিকিউরিটি’ কর্মসূচীর পরিচালক ড. গ্রেসলিন বাসকরান বলেন, ‘আধুনিক অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে তামা। কিন্তু আমাদের অবকাঠামোগত বড় ঘাটতি রয়েছে।’ তিনি মনে করেন, এই ঘাটতির কারণেই বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ছে।
গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক এক বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বালুচিস্তানের রেকো ডিক খনি থেকে খনিজ উত্তোলনের জন্য ১২৫ কোটি ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে আমেরিকার এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট (এক্সিম) ব্যাংক। কানাডীয় প্রতিষ্ঠান বারিক গোল্ডের মতে, এই রেকো ডিকেই রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তামার মজুদ, যা এখনো উত্তোলিত হয়নি।
১৯৫৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ২৪ বার ঋণ নিয়ে কোনোমতে খুঁড়িয়ে চলছে পাকিস্তানের অর্থনীতি। বারবার সংকটে পড়া দেশটি এখন মাটির নিচের এই খনিজ সম্পদকে দেখছে ভাগ্য বদলের বড় সুযোগ হিসেবে। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী সিএনএনকে বলেন, ‘পাকিস্তানের জনগণের সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কিছু দেওয়ার আছে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের এই তৎপরতা বেইজিংয়ের নজরেও পড়েছে। তবে পাকিস্তান তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র চীনকে আশ্বস্ত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ব্যবসায়িক সম্পর্কের ফলে বেইজিংয়ের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে না।
খনিজ সম্পদ নিয়ে বড় দেশগুলোর এই ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের আড়ালে সাধারণ মানুষকে লড়তে হচ্ছে এক রক্তক্ষয়ী লড়াই। উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের পেশোয়ার শহরের একটি হাসপাতালের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে শুয়ে আছেন কয়েক ডজন আহত যুবক। সেখানে বিপি মেশিনের বিপ বিপ শব্দ আর ব্যথায় কাতলানো কান্নার আওয়াজই এখন প্রধান।
সেখানে লাল কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন ৩০ বছর বয়সী আল্লাহ উদ্দিন। মাত্র এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানি তালেবানের এক অতর্কিত হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। মুহাম্মদ খেল তামার খনির কাছে একটি গাড়িবহর পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি। যুদ্ধে এটাই ছিল তার প্রথম অভিজ্ঞতা। সেই হামলায় দুই পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যাওয়া আল্লাহ উদ্দিনের এখন বড় দুশ্চিন্তা তার তিন সন্তান ও পরিবারকে নিয়ে।
মৃদু কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘জানি না অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে, তবে জঙ্গিদের হাতের অস্ত্রগুলো ছিল একদম অন্যরকম এবং অনেক বেশি শক্তিশালী।’
তিনি মূলত নির্দেশ করছিলেন ওই আধুনিক মার্কিন অস্ত্রের দিকেই, যা একসময় আফগানিস্তানে ব্যবহার করত মার্কিন সেনারা। আজ সেই অস্ত্রই পাকিস্তানের খনিজ সম্পদ আহরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় পাকিস্তানের জঙ্গিদের প্রধান অস্ত্র ছিল সোভিয়েত আমলের কালাশনিকভ (একে-৪৭) আর রকেট চালিত গ্রেনেড। কিন্তু এখন তাদের হাতে শোভা পাচ্ছে অত্যাধুনিক সব আমেরিকান অস্ত্র। যা সীমান্ত এলাকায় খনিজ সম্পদ আহরণের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পেশোয়ারের সামরিক হাসপাতালের সার্জন কর্নেল বিলাল সাঈদ বলেন, যুদ্ধের ধরণ বদলে গেছে। আগে তাদের কাছে আসা রোগীদের শরীরে মূলত আইইডির (হাতে তৈরি বোমা) ক্ষত থাকত। কিন্তু এখন তাঁরা এমন সব রোগী পাচ্ছেন, যাদের শরীরে স্নাইপারের গুলির ক্ষত।
আগে আহতদের দিনের বেলায় হাসপাতালে আনা হতো। এখন আনা হয় সূর্যাস্তের পর। এর কারণ ব্যাখ্যা করে ওই সেনা কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিদের হাতে এখন শুধু আধুনিক অস্ত্রই নয়, বরং রাতের অন্ধকারে দেখার জন্য ‘নাইট ভিশন’ যন্ত্রও রয়েছে। ফলে তারা অন্ধকারেই বেশি হামলা চালাচ্ছে।
হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে আল্লাহ উদ্দিনের মতো আরও অন্তত ১০ জন সেনাসদস্য চিকিৎসাধীন, যারা গত কয়েক সপ্তাহে জঙ্গি হামলায় আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে জঙ্গি হামলায় সেনাসদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও তালেবান ক্ষমতায় আসার সময়ের তুলনায় এই নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণ। একাধিক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় তাঁরা এখন রীতিমতো এক ‘যুদ্ধ’ করছেন।
দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় এখন ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের ট্রাক নিয়ে টহল দিতে দেখা যায়। ওয়ানার মতো বড় শহরগুলোর বিমানঘাঁটি এখন কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া। তবে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের যেখানে ‘মুহাম্মদ খেল’ তামার খনি অবস্থিত, সেখানে যাওয়ার কোনো অনুমতি মেলেনি। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, এলাকাটি এখন এতটাই বিপজ্জনক যে সেখানে চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
পেশোয়ারের সেই হাসপাতালের কাছেই সিএনএন প্রতিনিধিদের দেখানো হলো জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা একশরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র। সেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এম-১৬, এম-৪, এম২৪৯ মেশিনগান ও রেমিংটন স্নাইপার রাইফেল। প্রতিটিতে খোদাই করে লেখা রয়েছে—সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ মুবাশ্বের জানান, ২০২২-২৩ সাল থেকে তারা নিয়মিত জঙ্গিদের হাতে এসব মার্কিন অস্ত্র দেখছেন। এখন প্রায় প্রতিটি সম্মুখযুদ্ধেই এই আধুনিক অস্ত্রের দেখা মিলছে।
ওয়ানার কাছে একটি ক্যাডেট কলেজে হামলার পর উদ্ধার করা তিনটি এম-১৬ রাইফেলের সিরিয়াল নম্বর সংগ্রহ করেছে সিএনএন। এই অস্ত্রগুলো কীভাবে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানের জঙ্গিদের হাতে পৌঁছাল, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক তথ্য চেয়েছে তারা।
ওয়ানার কাছে একটি ক্যাডেট কলেজে হামলার পর উদ্ধার করা এম-১৬ রাইফেলের সিরিয়াল নম্বরগুলো যাচাই করেছে সিএনএন। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামায় অবস্থিত সেনাবাহিনীর ‘ম্যাটেরিয়াল কমান্ড’ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিটি রাইফেলই ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কয়েক বছর আগে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে সরবরাহ করা হয়েছিল।
শুধু পাকিস্তানি তালেবানই নয়, বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) নামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হাতেও এখন শোভা পাচ্ছে মার্কিন এম-১৬ এবং এম-৪ কার্বাইন রাইফেল। পাকিস্তানি সামরিক সূত্রগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কয়েক দশক ধরে বিএলএ বালুচিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশটি খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানেই অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামার খনি ‘রেকো ডিক’সহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ভাণ্ডার।
পাকিস্তানের সাধারণ সেনাসদস্যদের কাছে কি জঙ্গিদের মতো এই মানের অত্যাধুনিক অস্ত্র আছে? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুবাশ্বেরের উত্তর—’না’। অর্থাৎ, খোদ সেনাবাহিনীর চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে জঙ্গিদের হাতের অস্ত্র বেশি উন্নত ও শক্তিশালী।
গত সপ্তাহান্তেও বালুচিস্তানে বিএলএ এক সিরিজ সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, ওই হামলায় ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীও ১৩৩ জন জঙ্গিকে হত্যার দাবি করেছে। এই ক্রমাগত সহিংসতা বালুচিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের খনিজ নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে।
বালুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি সিএনএনকে বলেন, ‘প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, এসব হামলায় বেশ কয়েকজন আফগান নাগরিকও জড়িত। আর যেসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তার প্রায় সবই আফগানিস্তান থেকে আসা মার্কিন সরঞ্জাম—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘বালুচিস্তান বর্তমানে একই সঙ্গে দুটি চরম পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে এটি বিপুল খনিজ সম্পদের উজ্জ্বল সম্ভাবনার জায়গা, অন্যদিকে এটি এখন জঙ্গি ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রধান বিচরণক্ষেত্র।’
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে মার্কিন বাহিনী। এরপর সেখানে একটি নতুন আফগান সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ওয়াশিংটন। তাদের লক্ষ্য ছিল, এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তারা তালেবানকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল স্কট ইয়েটম্যান ছিলেন আফগান বিমানবাহিনীর শীর্ষ মার্কিন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘কেউ তো আর পরাজয় বা পতনের পরিকল্পনা করে না। আমাদের পরিকল্পনা ছিল অভিযান চালিয়ে যাওয়া এবং পতন ঠেকানো।’ কিন্তু অভাবনীয়ভাবে সেই মার্কিন প্রশিক্ষিত বাহিনীরই পতন ঘটে এবং ২০২১ সালে তালেবানরা পুনরায় কাবুল দখল করে।
২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনারা যখন চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ে, তখন তারা সেখানে ফেলে যায় অস্ত্রের এক বিশাল ‘গুপ্তধন’।
আফগানিস্তান পুনর্গঠন কর্মসূচির বিশেষ পরিদর্শক হিসেবে ১২ বছর কাজ করা জন সোপকো জানান, মার্কিন বাহিনী সেখানে প্রায় ৩ লাখ ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে রেখে এসেছে।
সোপকো সিএনএনকে বলেন, শুধু বন্দুকই নয়, আরও ফেলে আসা হয়েছে উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জাম, রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড লঞ্চার, মর্টার, কামান ও ভারী মেশিনগান। এমনকি রাতের অন্ধকারে দেখার অত্যাধুনিক নাইট ভিশন যন্ত্র এবং নজরদারি চালানোর উচ্চপ্রযুক্তির সরঞ্জামও এখন জঙ্গিদের দখলে।
মূলত আফগানিস্তানে ফেলে আসা আমেরিকার এই বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারই এখন প্রতিবেশী পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে এবং খনিজ সম্পদ আহরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আফগানিস্তান এখন কার্যত বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্রের বাজারে পরিণত হয়েছে। জন সোপকো নামের এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনি যদি কোনো জঙ্গি বা বিদ্রোহী সংগঠন চালাতে চান এবং তাদের জন্য অস্ত্রের খোঁজ করেন, তবে আফগানিস্তানই এখন আপনার জন্য সেরা জায়গা।’
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগানিস্তান তাদের দেশের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে। তবে তালেবান নেতারা এই অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছেন। এক বিবৃতিতে আফগান তালেবান জানিয়েছে, মার্কিন সেনারা চলে যাওয়ার সময় যেসব অস্ত্র ফেলে গেছে, তার সবই এখন তাদের ‘নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষায়’ রয়েছে।
তবে এই অস্ত্রগুলো যেভাবে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, তাকে ‘ভীতিকর’ বলে উল্লেখ করেছেন সোপকো। তিনি মনে করেন, বিষয়টি কেবল পাকিস্তানের জন্য নয়, বরং ইরান এমনকি চীনের জন্যও বড় দুশ্চিন্তার কারণ হওয়া উচিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, আফগান তালেবান যেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেলে আসা সব অস্ত্র ফেরত দিয়ে দেয়। কিন্তু তার সেই দাবিতে কান দেয়নি তালেবান কর্তৃপক্ষ। এই অস্ত্রগুলো ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পেন্টাগন বর্তমানে তালেবানের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে কি না, তা জানতে চেয়েছিল সিএনএন। তবে পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
অস্ত্র উদ্ধারে সফল না হলেও ট্রাম্প প্রশাসন অন্যদিক থেকে চাপ সৃষ্টি করছে। গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। একই মাসে বিএলএ, আইএস (খোরাসান) ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে দমনে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সংলাপ’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত জানুয়ারিতে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একটি যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া শেষ করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিল পদাতিক বাহিনীর দক্ষতা বাড়ানো এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান আরও জোরালো করা।
পাকিস্তানের খনিজ সম্পদ আহরণ করতে হলে এই নিরাপত্তার সংকট কাটিয়ে ওঠাই এখন ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের খনিজ সমৃদ্ধ এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সেখানে বিশ্বমানের খনি অবকাঠামো গড়ে তুলতে ইসলামাবাদ সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সমস্যার সমাধান করবই। আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।’
সেনা মুখপাত্রের এই বক্তব্যের অর্থ হলো—সামনে পাকিস্তানের দুর্গম পাহাড়গুলোতে আরও রক্তক্ষয়ী লড়াই অপেক্ষা করছে। পুনরুত্থিত এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো এখন আমেরিকার ফেলে যাওয়া আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। এই শক্তিশালী অস্ত্রের জোরে অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাচ্ছে।
বড় দেশগুলোর এই ভূ-রাজনৈতিক লড়াই আর খনিজ সম্পদের রাজনীতির আড়ালে পেশোয়ারের হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন আল্লাহ উদ্দিনের মতো যন্ত্রণাকাতর সেনারা। তাদের মধ্যে এখন কেবলই অসহায়ত্ব আর ক্ষোভ।
দুই পা হারানো আল্লাহ উদ্দিন সিএনএনকে বলেন, ‘হামলার সময় আমিও পাল্টা গুলি চালিয়েছিলাম, কিন্তু শত্রুদের নাগাল পাইনি।’ অর্থাৎ, জঙ্গিদের আধুনিক অস্ত্রের দাপটের কাছে অনেকটা অসহায় ছিলেন এই সেনাসদস্য।
নিজের বর্তমান অবস্থা এবং পাশে শুয়ে থাকা সহযোদ্ধাদের ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে আল্লাহ উদ্দিনের কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল হাহাকার। তিনি বলেন, ‘আমার অবস্থা একবার দেখুন, আমি কতটা ক্ষুব্ধ তা কি বুঝতে পারছেন? আমার সঙ্গীদের এই করুণ পরিণতি দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।’
পাকিস্তানের মাটির নিচের বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার এই লড়াইয়ে একদিকে যেমন বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন আছে, তেমনি আছে আল্লাহ উদ্দিনদের মতো সাধারণ সেনাদের রক্ত আর দীর্ঘশ্বাস। যা এখন পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন অমীমাংসিত সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।