বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব: ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান নরবনে
![]()
নিউজ ডেস্ক
সম্প্রতি খবরের শিরোনামে ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরবনে। নরবনের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’র একাংশ ক্যারাভান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দিনকয়েক আগে সেখান থেকে একাংশ লোকসভায় পড়তে চেয়েছিলেন বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী। তা নিয়ে উত্তাল হয় সংসদ।
এখনো প্রকাশিত হয়নি ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’। সংসদের নিয়মানুযায়ী অপ্রকাশিত বই থেকে সংসদে উদ্ধৃত করা যায় না। তাই রাহুল গান্ধীকে বলতে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এখন প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
জানুয়ারির শেষে আসামের শিলচরে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে মুখ্য অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান। সেখানে ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নরবণে বলেন, ”ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত তিব্বতের সঙ্গে থাকা সীমান্তের তুলনায় অনেক বেশি দুরূহ।” তার মতে, ”পার্শ্ববর্তী দেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতা থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সীমান্ত এলাকায়, যার সুযোগ নেয় রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিরা।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক সপ্তাহ আগে আসাম সফরে এসে দাবি করেছিলেন, ভারতে এখন আর অনুপ্রবেশ হচ্ছে না এবং অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে অভিযান চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরবনে মনে করেন, ”বাস্তব পরিস্থিতিতে অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।”
অভিবাসন ও অনুপ্রবেশ
অভিবাসন প্রসঙ্গে নরবনে বলেন, “অভিবাসন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মানুষ কাজের খোঁজে এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। যেমন ভারতের বিভিন্ন এলাকার লোকেরা মুম্বই বা দিল্লির মতো জায়গায় যান। উন্নত দেশের আশেপাশে থাকা রাষ্ট্রগুলোর লোকেরাও বিভিন্ন উপায়ে ঢুকে পড়েন। ভারতবর্ষে প্রথম থেকেই এ ধরনের অভিবাসন হয়েছে এবং আজও হচ্ছে। তবে এটা যেমন অবাধে হতে দেওয়া যায় না, তেমনই পুরোপুরি বন্ধ করাও সম্ভব নয়।”
নরবণের বলেন, “উত্তর-পূর্ব ভারতে অনুপ্রবেশের প্রধান উৎস বাংলাদেশ।” পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। আসামে গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি শনাক্তকরণ ও বিতাড়নের প্রক্রিয়া চলছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করেছিলেন, ২০২৫ সালে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সীমান্ত কেন বেশি সংবেদনশীল?
এই প্রসঙ্গে নরবনে বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর যে সীমানা আছে, সেগুলো অত্যন্ত জটিল। তার বড় অংশ নদী দিয়ে বিভক্ত, যেখানে কাঁটাতারের বেড়া বসানো প্রায় অসম্ভব। সীমান্তটি দীর্ঘও। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে সরলরেখায় মাপলে তা তিব্বত সীমান্তথেকেও দীর্ঘতর। ফলে আমাদের তরফ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও কিছুটা হলেও অনুপ্রবেশ হচ্ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয়, কারণ কিছু কিছু এলাকা ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত বন্ধুর।”
‘চিকেনস নেক’ ও বদলে যাওয়া উত্তর-পূর্ব
উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করা শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের মানচিত্রে একটি সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। দেশভাগের ফলে তৈরি হওয়া এই সংকীর্ণ ভূখণ্ড নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ৩০ জানুয়ারি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি করিডরের প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশে ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসানোর পরিকল্পনা করছে ভারতীয় রেল। পাশাপাশি রেললাইন চার লাইনে উন্নীত করার কথাও ভাবা হচ্ছে, যাতে উত্তর-পূর্বের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ আরও নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন করা যায়।
তবে প্রাক্তন সেনাপ্রধানের মতে, অতীতের সেই বাস্তবতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা আর যুক্তিসঙ্গত নয়। নরবনে বলেন, গত দুই দশকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত চিত্র আমূল বদলে গেছে। তার কথায়, “আজ উত্তর-পূর্বে রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর—সব ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অনেক বেশি সুসংহত। উত্তর-পূর্বে পর্যাপ্ত সেনার উপস্থিতি এবং ওই এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নতি আমাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভালো দিক। আমি চার দশক ধরে উত্তর পূর্বে আসা যাওয়া করছি। বিভিন্ন সময় আমার পোস্টিং ছিল এখানে। অতীতে চিকেনস নেক এলাকা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আমি পার হয়েছি এবং কিছুদিন আগেও একই কাজ করেছি। আগের চিত্র আর বর্তমান চিত্র পুরোপুরি আলাদা। তাই আমি মনে করি এটি কোনভাবেই আর ভারতের দুর্বলতা নয়।
নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
নরবনের মতে, উত্তর-পূর্বকে ঘিরে মাঝে মাঝে প্রতিবেশী কিছু মহল থেকে যে ‘সেভেন সিস্টার্স দখল’-জাতীয় বক্তব্য শোনা যায়, তা মূলত বাস্তবতাবিবর্জিত রাজনৈতিক স্লোগান। তবে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ যে নেই, তা নয়। তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলির ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নিয়ে, যারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা যুবকদের টার্গেট করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “শুধু বন্দুক বা গ্রেফতার দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর সমান জোর দিতে হবে।”
বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গেও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান। তার কথায়, ”ভারতের কৌশল কখনও আগ্রাসনমূলক নয়, কিন্তু সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা এমন যে প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিস্থিতি উপেক্ষা করা যায় না।” চার দশকেরও বেশি দীর্ঘ সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নরবনে বলেছেন, ”আজ উত্তর-পূর্ব ভারত আর শুধুই একটি ভৌগোলিক প্রান্ত নয়, বরং ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এক কৌশলগত কেন্দ্র।”
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।