মিয়ানমার ঘিরে চীনের কূটনীতি: জান্তার ভরসা বেইজিং, উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন

মিয়ানমার ঘিরে চীনের কূটনীতি: জান্তার ভরসা বেইজিং, উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন

মিয়ানমার ঘিরে চীনের কূটনীতি: জান্তার ভরসা বেইজিং, উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমার থেকে শুরু করে এশিয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে চলতি সপ্তাহে চীনের ভূমিকা ও তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামরিক জান্তার সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা, বিতর্কিত নির্বাচনে সমর্থন, অনলাইন প্রতারণা চক্র দমনে চাপ, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কবার্তা এবং বিরল খনিজ ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে চীনের কৌশলগত উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ইয়াঙ্গুনে চীনা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী নিয়ো সো “পাউক-ফাও” বা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে চীনের প্রতি জান্তার নির্ভরতার বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা’ রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সমঝোতা হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই শব্দগুচ্ছের আড়ালেই সীমান্ত এলাকায় চীনের নিরাপত্তা ভূমিকার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বছর উত্তর শান ও মান্দালয় অঞ্চলে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অগ্রগতি হঠাৎ থামাতে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মিয়ানমার ঘিরে চীনের কূটনীতি: জান্তার ভরসা বেইজিং, উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন

নিয়ো সো একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার জান্তাকে রক্ষায় চীনের অবস্থানের জন্য ‘গঠনমূলক সমর্থন’-এর কথাও বলেন। অনুষ্ঠানে জান্তার মদদপুষ্ট ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) চেয়ারম্যান খিন ইসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চীনের রাষ্ট্রদূত মা জিয়া ইউএসডিপির নির্বাচনী ‘জয়’-এর জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শুভেচ্ছাবার্তা খিন ইয়ির হাতে তুলে দেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত ও দেশের ভেতরে ব্যাপক বয়কটের মুখে অনুষ্ঠিত জান্তার নির্বাচনের প্রতি চীন আবারও সমর্থন জানিয়েছে। বেইজিংয়ে এক ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, চীন ‘মিয়ানমারের জনগণের পছন্দকে সম্মান করে’ এবং দেশটির ‘জাতীয় বাস্তবতার উপযোগী উন্নয়ন পথ’-কে সমর্থন করে। তিনি শান্তি, সমঝোতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা পুনরুল্লেখ করেন। চীনা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন ধাপে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন শি জিনপিং ও মিন অং হ্লাইংয়ের মধ্যে সমঝোতার ফল।

মিয়ানমার ঘিরে চীনের কূটনীতি: জান্তার ভরসা বেইজিং, উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন

চীনের চাপেই অনলাইন প্রতারণা চক্র দমনে নতুন করে অভিযান চালিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। গত এক সপ্তাহে শান রাজ্যের মংইয়াই ও কুনহিং এলাকায় অনলাইন স্ক্যাম কার্যক্রমে জড়িত ৫৬০ জনের বেশি চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জান্তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, শক্তিশালী কম্পাউন্ড ছেড়ে প্রতারক চক্রগুলো দুর্গম এলাকায় অস্থায়ী স্থাপনায় সরে গেছে। ২০২৪ সালে ‘অপারেশন ১০২৭’-এর সময় লাউকাই দখলের পর কোকাংয়ের ‘বিগ ফোর’ পরিবারের প্রতারণা সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লে এসব নেটওয়ার্ক শান রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির তথ্য অনুযায়ী, ৩৪টি টাউনশিপে ৭৫টির বেশি নতুন স্ক্যাম সেন্টার শনাক্ত হয়েছে।

চীনের সর্বোচ্চ কৌঁসুলির দপ্তর জানিয়েছে, গত বছরের প্রথম ১১ মাসে উত্তর মিয়ানমার থেকে ফেরত আনা ১১ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে টেলিকম জালিয়াতির অভিযোগে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে এ অভিযানে ৪৮ হাজারের বেশি সন্দেহভাজনের গ্রেপ্তার অনুমোদন দেওয়া হয়।

মিয়ানমার ঘিরে চীনের কূটনীতি: জান্তার ভরসা বেইজিং, উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন

এশিয়ার বাইরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন টানাপোড়েনও তীব্র হচ্ছে। ফোনালাপে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাইওয়ান প্রশ্নে ‘সতর্কতা’ অবলম্বনের আহ্বান জানান। বেইজিংয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, তাইওয়ানকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্ক ‘অটুট’ রয়েছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় শি জিনপিং ‘বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার’ নামে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার আহ্বান জানান। নিউ স্টার্ট পারমাণবিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিরল খনিজ ঘিরেও চীনকে চ্যালেঞ্জ দিতে মাঠে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। ৫০টির বেশি দেশকে সঙ্গে নিয়ে চীনের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার উদ্যোগে মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীন মিয়ানমার থেকে চার বিলিয়ন ডলারের বেশি বিরল খনিজ আমদানি করেছে, যার ৮৪ শতাংশই এসেছে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর।

প্রসঙ্গত, সামরিক শাসনের পর থেকে মিয়ানমার কূটনৈতিকভাবে আরও বেশি চীনমুখী হয়ে পড়লেও, এই নির্ভরতা দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

– দ্য ইরাবতী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *