ভারতের দোদুল্যমান অবস্থায় রাশিয়ার তেল কিনতে এগিয়ে এসেছে চীন

ভারতের দোদুল্যমান অবস্থায় রাশিয়ার তেল কিনতে এগিয়ে এসেছে চীন

ভারতের দোদুল্যমান অবস্থায় রাশিয়ার তেল কিনতে এগিয়ে এসেছে চীন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ঐকমত্য হয়েছে; ওই চুক্তির মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বিদ্যমান ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে। কিন্তু, এর বিনিময়ে অন্যান্য বাণিজ্য ছাড়ের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করবে ভারত। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর থেকেই নতুন করে আলোচনায় আসে নয়াদিল্লির সঙ্গে রাশিয়ার তেল বাণিজ্য।

২০২২ সালের পর মস্কোর অন্যতম বৃহৎ জ্বালানির ক্রেতা হয়ে ওঠে ভারত। তবে পশ্চিমা চাপের মুখে এই ক্রেতাকে হারানোর সম্ভাবনা রাশিয়ার রপ্তানি আয় ও বাজেট স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি করেছে। যদিও বিদ্যমান বাণিজ্য তথ্য রাশিয়ার জন্য আপাত স্বস্তির এক অন্য চিত্র তুলে ধরছে।

সংখ্যাগুলো স্পষ্ট: রাশিয়ান জালানির জন্য এখনো আশার আলো দেখিয়েই যাচ্ছে চীন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি চীন–রাশিয়া তেল বাণিজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে সমুদ্রপথে রপ্তানি দাঁড়ায় দৈনিক ১৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলে—যা আগের রেকর্ড গড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিকেও ছাড়িয়ে গেছে। মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি লোড বা জাহাজে ভরা হয় রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তকের কাছে কোজমিনো ও সাখালিনে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর প্রথমবারের মতো রাশিয়ার ইএসপিও গ্রেডের শতভাগ রপ্তানি গেছে চীনে।

পাইপলাইনে সরবরাহ হওয়া দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল বাদ দিলেও, শুধু সমুদ্রপথে রাশিয়ার রপ্তানি জানুয়ারিতে সৌদি আরবের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি ছিল। ওই মাসে রিয়াদ চীনে পাঠিয়েছে মাত্র ১২ লাখ ব্যারেল দৈনিক, যদিও দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় সমুদ্রপথের জ্বালানি তেলের সরবরাহকারী ছিল সৌদি আরব।

দামের বিষয়টি এখানে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকেরা প্রায়ই রাশিয়ার মূল্যছাড়ের মাত্রা অতিরঞ্জিত করে দেখান। বাস্তবে, ভারতীয় চাহিদা দুর্বল হওয়ার পর উরালস গ্রেডের ক্ষেত্রে এই ছাড় এখন আইসিই ব্রেন্টের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭ ডলারের কাছাকাছি। এই ব্যবধানই চীনা শোধনাগারগুলোর কাছে রাশিয়ার তেলকে আকর্ষণীয় করে তুলতে যথেষ্ট। বিশেষ করে যখন পরিবহন, বিমা ও নিরাপত্তার বড় অংশের ঝুঁকি মস্কো নিজেই বহন করে—যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার বাণিজ্য মডেলের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। কার্যত,ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির বড় অংশ রাশিয়া নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে, ফলে চীনা ক্রেতারা মূলত দাম ও সরবরাহের স্থিতিশীলতার দিকেই মনোযোগ দিতে পারছে।

কৌশলগত বিবেচনাও এই বাণিজ্যিক যুক্তিকে আরও জোরালো করেছে। ওয়াশিংটনের ক্রমেই সংঘাতমুখী পররাষ্ট্রনীতি বেইজিংয়ের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীর সংখ্যা সীমিত করে দিয়েছে। ২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি চীনে দৈনিক গড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ ব্যারেলে থাকলেও, রাজনৈতিকভাবে এই সরবরাহ নির্ভরযোগ্য নয়। ইরান থেকে চীনে তেল সরবরাহ—যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে গড়ে দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল ছিল—২০২৫ সালের জুনের পর থেকে কমতে শুরু করে। এর পেছনে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলা এবং তেহরানের তেল বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

এসব বিঘ্ন বেইজিংকে দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল কত দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ছাড়মূল্যে, ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি এবং রাজনৈতিক কারণে সহজে বিঘ্নিত না হওয়া রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বড় পরিসরে একমাত্র এমন উৎস হয়ে উঠেছে, যেখানে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ও পূর্বানুমেয়তা পাওয়া যায়। এর ওপর, চীনে রাশিয়ার তেল রপ্তানির সবচেয়ে বড় টার্মিনাল কোজমিনো থেকে চালান প্রধান চীনা বন্দরে পৌঁছাতে লাগে মাত্র ৫–৬ দিন; যা একে শুধু নিরাপদ নয়, বরং সবচেয়ে নিকটবর্তী বড় উৎসগুলোর একটি করে তুলেছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন এই বাণিজ্যিক বন্ধনকে আরও শক্ত করে বেঁধে দিয়েছে। চীনের নতুন শানডং ইউলং শোধনাগার—যার সক্ষমতা দৈনিক ৪ লাখ ব্যারেল—ক্রমেই রাশিয়ামুখী ক্রেতা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা, পরে রোসনেফট ও লুকঅয়েলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ কার্যত শোধনাগারটিকে পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ সরবরাহ চ্যানেল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বিকল্প কম থাকায় ইউলং প্রায় পুরোপুরি রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে কানাডা থেকে দুটি কার্গো ছাড়া, ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর থেকে শোধনাগারটি একচেটিয়াভাবে রাশিয়ার তেলই ব্যবহার করছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তারা রাশিয়া থেকে গড়ে দৈনিক ২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল আমদানি করেছে। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইতোমধ্যে রাশিয়ার ইএসপিও গ্রেডের তেল-বোঝাই দুটি আফ্রাম্যাক্স ট্যাংকার সেখানে খালাস হয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

বেইজিং ও মস্কোর ক্রমবর্ধমান সংযোগ ভারতের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিও নতুন করে গড়ে দিচ্ছে। চীন–রাশিয়া জ্বালানি সম্পর্ক যদি দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হয়, তাহলে এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য করিডোর থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নয়াদিল্লিতে বাড়বে। ভারতের জন্য তেল আমদানি ক্রমেই শুধু বাণিজ্যিক বিষয় নয়, বরং ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। রাশিয়া যখন চীনকে তার প্রধান এশীয় বাজার হিসেবে বেছে নিচ্ছে, তখন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ভারত শেষ পর্যন্ত আবার রাশিয়ার তেলের দিকেই ফিরতে পারে—এর পেছনে শুধু দামের প্রণোদনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বে কৌশলগতভাবে মস্কোর থেকে বিচ্ছিন্ততা এড়ানোর তাগিদও কাজ করবে।

কারণ, নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনের সাথে চললেও, মস্কো-বেইজিং ঘনিষ্ঠতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ভারত রাশিয়ার জ্বালানি বাজার থেকে পুরোপুরি সরে গেলে যেখানে বেইজিং আরও সুবিধে করে নিতে পারবে।

ফলে এই গতিপথ যদি বজায় থাকে, তাহলে রাশিয়ার জ্বালানি আয়ে লাগাম টানতে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যিক চাপ উল্টো ফল দিতে পারে। মস্কোকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে এটি চীনের চাহিদা ও রাশিয়ার সরবরাহকে কেন্দ্র করে আরও শক্তিশালী ইউরেশীয় জ্বালানি জোট গঠনের গতি বাড়াচ্ছে। ভারত এই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত আবার এতে যুক্ত হতে পারে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপের তিন বছর পরও রাশিয়া তার সবচেয়ে বড় ক্রেতার কাছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করছে। শেষ পর্যন্ত তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে ওয়াশিংটনের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী বেইজিং। চীন তুলনামূলক কম ঝুঁকি নিয়ে ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক দামে আরও বেশি তেলের জোগান নিশ্চিত করছে। আপাতত কোজমিনোসহ বিভিন্ন পথে রেকর্ড প্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে—ওয়াশিংটনের চাপ বাণিজ্য পথ বদলাচ্ছে, কিন্তু ভাঙতে পারছে না।

লেখক: নাতালিয়া কাতোনা সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একজন ফ্লিল্যান্স আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার বিশ্লেষক। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *