কারেন্নি নিয়ন্ত্রিত মাওচি খনি পুনর্দখলে জান্তার সেনা সমাবেশ, সীমান্ত বাণিজ্য ব্যাহত
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের কারেন্নি রাজ্যের টিন ও টাংস্টেনসমৃদ্ধ খনি অঞ্চল মাওচিকে ঘিরে ব্যাপক সেনা সমাবেশ করছে জান্তা বাহিনী। সম্মুখসারির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিরোধ বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎসে পরিণত হওয়া এই খনি পুনর্দখলই জান্তার মূল লক্ষ্য।
হপাসাওং টাউনশিপে অবস্থিত মাওচি ২০২৪ সালের শুরুর দিক থেকে কারেন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রায় এক হাজার সেনাসদস্যের একটি বাহিনী হপাসাওং শহরে প্রবেশ করে। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দাবি, নিকটবর্তী খনিগুলো পুনর্দখলের উদ্দেশ্যেই এ অভিযান।
প্রতিরোধ সূত্র জানায়, জান্তা ইউনিটগুলো হপাসাওংয়ের জেদি পাহাড়ে একটি ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং অগ্রযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক প্রতিরোধ সদস্য বলেন, “তাদের মিশন মাওচি পুনর্দখল করা। আমরা ভারী অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে হপাসাওং থেকে সরে এসেছি। এ সপ্তাহে নেপিদো থেকে আরও ২০০ জান্তা সেনা লোইকাওয়ে মোতায়েন হয়েছে, তারা হপাসাওংয়ের দিকেই আসছে।”
হপাসাওং ও পার্শ্ববর্তী মেসে সংযোগকারী সালউইন নদীর ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু জান্তা সেনারা শহরে প্রবেশের পর দ্বৈত বিস্ফোরণে ধ্বংস করা হয়। এর কয়েকদিন পর ২০ ফেব্রুয়ারি হপাসাওংয়ের পন চাউং খালের ওপর ছোট একটি সেতুও উড়িয়ে দেওয়া হয়। কোনো গোষ্ঠী দায় স্বীকার না করলেও জান্তা বাহিনী এ ঘটনার জন্য কারেন্নি আর্মি, কারেন্নি ন্যাশনালিটিজ ডিফেন্স ফোর্স এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্সকে দায়ী করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাওলাখে থেকে হপাসাওংয়ে অতিরিক্ত সেনা আনার জন্য জান্তা বাহিনী পন চাউং সেতুর স্থলে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করেছে।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর দলত্যাগ করা সাবেক ক্যাপ্টেন জিন ইয়াও বলেন, সামরিক বাহিনী মাওচিতে পূর্ণাঙ্গ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, “তারা হপাসাওংয়ে পৌঁছেছে, কিন্তু সালউইন সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় মেসের পথে অগ্রসর হতে পারেনি। তাই লোইকাও থেকে আরও শক্তিবৃদ্ধি আসা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করছে। এরপরই মাওচিতে হামলা চালাবে।”
চলমান সংঘর্ষে থাইল্যান্ড সীমান্তমুখী বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে মাওচিতে পণ্যের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আগে ২ হাজার কিয়াত দামের এক আঁটি সবজি এখন ৭ হাজার কিয়াতে বিক্রি হচ্ছে।
জান্তা সেনারা জেদি পাহাড়ে সালউইন নদী তীরবর্তী কৌশলগত অবস্থানগুলো শক্তিশালী করেছে। বাওলাখে-হপাসাওং সড়কের দুটি গ্রামের কাছে প্রতিদিনই প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে, যেখানে বিমান হামলার সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে কারেন্নি বাহিনী মাওচি ও এর খনিগুলো দখলে নেয় এবং মেসে হয়ে থাইল্যান্ডে আকরিক বিক্রি শুরু করে। লোইকাওয়ের এক সাবেক ব্যবসায়ী বলেন, জান্তা বাহিনী এখন এই রাজস্বের উৎস বন্ধ করতে তৎপর। তিনি বলেন, “তারা যদি মাওচি দখল করতে পারে, তবে প্রতিরোধের আয়ের পথ রুদ্ধ হবে এবং নিজেরাই খনি চালু করতে পারবে। লোইকাও থেকে মাওচির সড়ক পুনরায় খুললে ব্যবসায়ীরাও ফিরতে পারে।”
ঔপনিবেশিক আমল থেকে মাওচি লাভজনক খনি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯১১ সালে এখানে প্রথম বাণিজ্যিক খনি চালু হয়। ২০০২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সামরিক মালিকানাধীন মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিংস লিমিটেড (এমইএইচএল) ‘কেএমপিসি’ নামে মাওচি খনি পরিচালনা করে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এসব খনি থেকে ৮ হাজার ৪০০ মেট্রিক টনের বেশি আকরিক উৎপাদিত হয়েছে। সর্বশেষ সংঘাত শুরুর আগে প্রতি ভিস (১ দশমিক ৬ কেজি) আকরিকের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৮০ হাজার কিয়াত (প্রায় ২০ মার্কিন ডলার)। তবে সড়ক বন্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে খনি শ্রমিকরা দ্রুত বিক্রিতে ঝুঁকছেন, ফলে দাম নেমে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার কিয়াতে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, কারেন্নি অঞ্চলের খনিজ সম্পদ ঘিরে জান্তা ও প্রতিরোধ বাহিনীর এই সংঘর্ষ দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলছে এবং সীমান্তবর্তী বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।