রত্ন প্রদর্শনীতে মিয়ানমার-চীন সমঝোতা, বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে জান্তা
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমার ও চীন যৌথভাবে চীনের জিয়েগাও সীমান্ত বাণিজ্য এলাকায় একটি রত্ন প্রদর্শনী আয়োজনের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। উত্তর শান রাজ্যের মুসের বিপরীতে অবস্থিত একসময়কার জমজমাট এই সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্রকে ঘিরে নেওয়া এই উদ্যোগকে জান্তার রত্ন অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা, সংঘাত এবং চাহিদা ধসে পড়ায় মিয়ানমারের রত্নখাত গভীর সংকটে রয়েছে।
জান্তা সরকারের প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী খিন মাউং ই ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউনান প্রদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ চুক্তি সই করেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। জান্তা বলেছে, রত্ন বাণিজ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, চোরাচালান দমন এবং পরিবেশগত সমন্বয় জোরদারই এ সমঝোতার লক্ষ্য। যদিও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে চীনের মাটিতে ‘মিয়ানমার ব্র্যান্ডেড’ রত্ন প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্তকে বেইজিংয়ের সঙ্গে জান্তার সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের উচ্চমূল্যের জেডাইট পাথরের প্রধান ক্রেতা চীন। ইউনান ও গুয়াংডং প্রদেশে খোদাই, গয়না ও বিলাসপণ্যের বাজারে এই জেডাইটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কাচিন রাজ্যে উত্তোলিত কাঁচা পাথর বৈধ ও অবৈধ পথে মুসে-রুইলি সীমান্ত অতিক্রম করে তেংচং, গুয়াংজু, সিহুই ও জিয়েয়াংয়ের মতো চীনের বৃহৎ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পৌঁছাত। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও জেডাইট সীমান্ত বাণিজ্যের অন্যতম স্তম্ভ ছিল।
তবে এই শিল্প সহিংসতা, দুর্নীতি ও পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হপাকান্ত এলাকায় ধারাবাহিক সামরিক সরকার, প্রভাবশালী গোষ্ঠী, মিলিশিয়া ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো খনি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে ভূমিধস ও খনি ধসে গত এক দশকে শত শত, এমনকি হাজারো অভিবাসী খনি শ্রমিক নিহত হয়েছেন; পাশাপাশি পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর রাজস্বের তীব্র চাহিদা এই অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে। জান্তা মান্দালয়ের অনানুষ্ঠানিক জেড বাজারে অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করে এবং উইচ্যাটের মাধ্যমে কর ফাঁকি দিয়ে বিক্রির অভিযোগ তোলে। তারা সব বাণিজ্য নেপিদোর নিয়ন্ত্রিত মাহা অং মিয়ায় সরকারি বাজারের মাধ্যমে পরিচালনার নির্দেশ দেয়, যাতে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়।
জাতীয় পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য জান্তা নেপিদোতে বার্ষিক রত্ন মেলায় ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, বিশেষত যুদ্ধব্যয় বাড়তে থাকায়। অংশগ্রহণ কমলেও এসব মেলার পরিধি প্রতিবছরই বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৬০তম মিয়ানমার জেমস এম্পোরিয়াম আয়োজন করা হয়, যেখানে ৫ হাজারের বেশি অপরিশোধিত জেড লট এবং শত শত রত্ন, গয়না ও মুক্তার লট প্রদর্শিত হয়। উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে মার্কিন ডলার, ইউরো, ইউয়ান ও থাই বাতসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রায় বিক্রি হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং উপস্থিত ছিলেন, যা এ আয়োজনের রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

তবে এসব মেলা প্রকৃত ক্রেতা আকর্ষণে হিমশিম খাচ্ছে। একসময় বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি চীনা ব্যবসায়ীরা সীমান্ত বন্ধ, অবৈধ অর্থ লেনদেনে বেইজিংয়ের কঠোর নজরদারি এবং উইচ্যাটভিত্তিক লেনদেনে দমন অভিযানের কারণে দূরে সরে গেছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, অনেক চীনা ব্যবসায়ী সরাসরি উত্তর মিয়ানমারের খনি এলাকা থেকেই পাথর কিনতেন।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনা কর্তৃপক্ষ রুইলির জেড বাজারে অভিযান চালায় এবং সীমান্তপারের অর্থপ্রবাহে কড়াকড়ি আরোপ করে। এতে মিয়ানমারের জেডের চাহিদা প্রায় রাতারাতি ধসে পড়ে।
দশকের পর দশক ধরে উত্তর মিয়ানমারের প্রায় সব সশস্ত্র পক্ষই জেডের অর্থে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়েছে। ২০২৪ সালে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি হপাকান্তের বড় অংশ দখলে নিয়ে খনি ও জ্বালানিতে নিজস্ব কর আরোপ করে। মান্দালয় ও কাচিনের মধ্যে পরিবহনপথ বারবার সংঘর্ষে বিঘ্নিত হয়। জবাবে ২০২৫ সালে জান্তা কয়েক মাসব্যাপী ভারী সামরিক অভিযান চালিয়ে হপাকান্ত পুনর্দখল করে, তবে এতে খনি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে জান্তা রত্ন বিপণন বৈচিত্র্যকরণের চেষ্টাও চালাচ্ছে। জান্তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার পার্ল এন্টারপ্রাইজ ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত হংকংয়ে ‘সাউথ সি পার্ল অকশন’ আয়োজন করে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নাননিংয়ে ‘দ্য সোল ট্রেজার অব মিয়ানমার’ শীর্ষক একটি প্রচারমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রী চিট সোয়ে মিয়ানমারের রুবি ও নীলা পাথরের মানের প্রশংসা করে বলেন, দেশের নীলা বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং চীনা ক্রেতাদের জেডের মতোই এসব রত্ন গ্রহণের আহ্বান জানান।
একই অনুষ্ঠানে ইয়াঙ্গুন অঞ্চল জেমস অ্যান্ড জুয়েলারি উদ্যোক্তা সমিতি ও মিয়ানমার ট্রেড সেন্টার (হাইনান) চীনে যৌথভাবে মিয়ানমারের রত্ন প্রচারে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। জান্তা গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গুয়াংসি, গুয়াংডং, হুনান, ইউনান, হাইনান, হংকং ও ম্যাকাও থেকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
মান্দালয় অঞ্চলের উত্তরে শান রাজ্যের নিকটবর্তী মোগোককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রঙিন রত্নখাতও সংঘাতে বিপর্যস্ত। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে জান্তা তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির কাছ থেকে এলাকা পুনর্দখল করে। গ্লোবাল উইটনেসের হিসাবে, মিয়ানমারের রঙিন রত্ন শিল্পের আনুষ্ঠানিক বার্ষিক মূল্য ৩৪৬ থেকে ৪১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, তবে প্রকৃত মূল্য এর পাঁচগুণ পর্যন্ত হতে পারে বলে সংস্থাটির ধারণা। ১৯৯০-এর দশকে সামরিক বাহিনী তাদের কনগ্লোমারেট এমইসি ও এমইএইচএলের মাধ্যমে রুবি খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করে, যা বর্তমানে মিন অং হ্লাইংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা জোরদার হওয়া এবং খনি অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার প্রেক্ষাপটে জান্তা এখন জেড, রুবি ও নীলা শোষণে চীনের বাজারের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। জিয়েগাওয়ে নতুন রত্ন প্রদর্শনী আয়োজনের উদ্যোগকে জান্তার অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎস রক্ষায় চীনের ছায়াতলে পুনর্গঠনের স্পষ্টতম ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিয়ানমার-চীন সম্পর্কের এক পর্যবেক্ষক বলেন, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে নতুন বাজার খুঁজে পাওয়ার এটি জান্তার সর্বশেষ চেষ্টা। তার ভাষায়, “এটা রত্নখাত থেকে অর্থ পাম্প করে বের করে নেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।”
অন্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউনানের সঙ্গে এই সমঝোতা মূলত ধসে পড়া শিল্পকে স্থিতিশীল করতে বাণিজ্যকে চীনের নিয়ন্ত্রক ও বাণিজ্যিক পরিসরের আরও কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়ার কৌশল। তাদের মতে, জিয়েগাওয়ের মতো চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় মিয়ানমারের রত্ন প্রদর্শনী আয়োজন জান্তার বেইজিংয়ের ওপর গভীর নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়, এমন এক সময়ে যখন তাদের বিকল্প পথ প্রায় নেই।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।