ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রভাব, মিয়ানমার জান্তার জ্বালানি ও ড্রোন সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রভাব, মিয়ানমার জান্তার জ্বালানি ও ড্রোন সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রভাব, মিয়ানমার জান্তার জ্বালানি ও ড্রোন সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা

An oil tanker is pictured off the Iranian port city of Bandar Abbas, which is the main base of the Islamic republic's navy and has a strategic position on the Strait of Hormuzon April 30, 2019. (Photo by ATTA KENARE / AFP)

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরানের চলমান প্রতিক্রিয়ার ফলে তেহরানের পক্ষে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে জেট জ্বালানি ও সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইরান-সংযুক্ত ‘ঘোস্ট শিপ’ বা পরিচয় গোপনকারী জাহাজের মাধ্যমে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা মিয়ানমার সামরিক সরকারের কাছে বিমান জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। এই জ্বালানি ব্যবহার করে জান্তা প্রতিদিন প্রো-গণতন্ত্র বিদ্রোহী ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ইরান কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে মিয়ানমারে সামরিক ড্রোনও পাঠিয়েছে। অভ্যুত্থানের পর তেহরান ও নেপিদোর মধ্যে গোপন সামরিক সহযোগিতা শুরু হয় এবং সময়ের সঙ্গে তা আরও গভীর হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বন্দরগুলোতে সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার ফলে মিয়ানমারগামী জেট জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রভাব, মিয়ানমার জান্তার জ্বালানি ও ড্রোন সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সহ-আঞ্চলিক পরিচালক মনসে ফেরার মঙ্গলবার দ্য ইরাবতীকে বলেন, ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী কৌশলগত প্রণালী হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। সেখানে বড় বড় পরিবহন সংস্থা কার্যক্রম স্থগিত করায় মিয়ানমারের জ্বালানি সরবরাহ দ্বিগুণ ধাক্কার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা যে সরবরাহ শৃঙ্খল নথিবদ্ধ করেছি, তা যদি হরমুজ প্রণালীকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তা গুরুতর প্রভাবের মুখে পড়বে। উপরন্তু জ্বালানি যদি ইরানের বন্দর থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে, তবে প্রভাব আরও মারাত্মক হবে এবং সরবরাহকারীরা হয়তো আর জেট জ্বালানি দিতে সক্ষম হবে না।”

অ্যামনেস্টি সতর্ক করে বলেছে, ইরানি সরবরাহে বাধা এলে জান্তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিরে গিয়ে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন ও মালয়েশিয়ায় পূর্ববর্তী সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।

একজন মিয়ানমার সামরিক বিশ্লেষক দ্য ইরাবতীকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা তেহরানের অস্ত্র রপ্তানির সক্ষমতাও দুর্বল করে দিতে পারে। তিনি বলেন, “চলমান সংকট শুধু ঘোস্ট শিপের মাধ্যমে জেট জ্বালানি সরবরাহই নয়, বরং জান্তার কাছে ড্রোন রপ্তানিও বন্ধ করে দিতে পারে।”

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্টে (সিডিএম) যোগ দেওয়া সাবেক বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট নে উইন আউং বলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় জান্তা দেশীয় শোধনাগারগুলো—যেমন থানলিন অয়েল রিফাইনারি—চালু করে নিজস্ব জেট জ্বালানি উৎপাদনের চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে আরেক সাবেক কর্মকর্তা মেজর সোয়ে তাও, যিনি অভ্যুত্থানের পর দলত্যাগ করেন, সতর্ক করে বলেন, ইরানি সরবরাহ বন্ধ হলে জান্তা তাদের প্রধান মিত্র রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে।

মিয়ানমার বিষয়ক বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন বলেন, নেপিদো-তেহরান সম্পর্ক কৌশলগতের চেয়ে বেশি লেনদেনভিত্তিক হওয়ায় জান্তা বিকল্প উৎস থেকে জেট জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।

‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ (জেএফএম) জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব নজরদারি করছে—শুধু ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলাই নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ইরানি প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। কারণ আমিরাতভিত্তিক কোম্পানিগুলো মিয়ানমারে একাধিক জ্বালানি চালানে জড়িত ছিল।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রভাব, মিয়ানমার জান্তার জ্বালানি ও ড্রোন সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা

অধিকার সংগঠনটি বলেছে, জান্তা ও তাদের জেট জ্বালানি সরবরাহকারীরা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে এবং প্রাণঘাতী বিমান হামলার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সচেষ্ট রয়েছে। “মিয়ানমারের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যতদিন জান্তা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের বিমান জ্বালানি সংগ্রহ ও ব্যাংকিং সুবিধা পেতে সহায়তা করবে, ততদিন এসব কৌশল অব্যাহত থাকবে,” সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন জেএফএম মুখপাত্র ইয়াদানার মাউং।

সংগঠনটি সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, জাহাজ, মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি টার্মিনাল এবং মিয়ানমা পেট্রোকেমিক্যাল এন্টারপ্রাইজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জান্তার অর্থায়ন ও জেট জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করতে। পাশাপাশি কানাডার মতো মিয়ানমারে জেট জ্বালানি রপ্তানি, বিক্রি ও সরবরাহ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্পেশাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর মিয়ানমার (এসএসি-এম)–এর কনর ম্যাকডোনাল্ড বলেন, “জান্তার বিমানবাহিনী বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বোমা বর্ষণের জন্য আমদানিকৃত বিমান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এটি ছাড়া তাদের যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার উড়তে পারে না। রাষ্ট্রগুলোকে এই সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দিতে এবং জান্তার নৃশংসতা চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

তিনি যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াকে জান্তার কাছে বিমান জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজ ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আসিয়ান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ‘রিফ’ ও ‘নোবেল’ নামে দুটি ঘোস্ট শিপ ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নয়টি চালানে মোট প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টন জেট জ্বালানি মিয়ানমারে সরবরাহ করেছে।

অ্যামনেস্টি আরও জানিয়েছে, চীনা পতাকাবাহী ‘হুইতং ৭৮’ জাহাজ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মিয়ানমারে জেট জ্বালানি সরবরাহ করে। একই জাহাজ ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অন্তত ১০টি চালান দেয়। ধারণা করা হয়, জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলীয় নোঙর এলাকায় জ্বালানি বোঝাই করেছিল। আরেকটি চীনা পতাকাবাহী জাহাজ ‘ইয়ং শেং ৫৬’ (বর্তমানে ‘এলএস মার্কারি’) ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত উপকূল থেকে জ্বালানি বোঝাই করে মিয়ানমারে সরবরাহ করে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

মিয়ানমার পোর্ট অথরিটির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, শুধু ২০২৫ সালেই অন্তত ১ লাখ ৯ হাজার ৬০৪ টন বিমান জ্বালানি আমদানি হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি এবং অভ্যুত্থানের পর যেকোনো বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ—নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও।

সিভিলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) মানবাধিকার মন্ত্রণালয়ের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জান্তা মোট ১০ হাজার ৩৪৮টি বিমান হামলা চালিয়েছে—যার বেশিরভাগই গ্রাম, শহর, স্কুল, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থাপনার মতো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে। এতে ৬৭৮ শিশুসহ ৪ হাজার ৯৯১ জন নিহত এবং ১ হাজার ২ জন শিশুসহ ৬ হাজার ৮৬৩ জন আহত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে জান্তার সামরিক সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।