বড় ক্ষতিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ, ভর্তুকি বাড়ার শঙ্কা
![]()
নিউজ ডেস্ক
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির এলএনজি অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ায় জ্বালানি খাতে বড় চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। দেশের এলএনজি আমদানির সিংহভাগ কাতারনির্ভর। ইতোমধ্যে সাতটি এলএনজি কার্গো বাতিল করেছে কাতার। ফলে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ। এতে করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চাইলে সরকারকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। আর সরবরাহ কমানো হলে আসন্ন গ্রীষ্মে তীব্র লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি রয়েছে। একইসঙ্গে শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট তৈরি হলে উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
হামলার পর কাতার জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ পুনরায় শুরু করতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে এবং পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এক মাস পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে সম্পূর্ণ ক্ষতি কাটিয়ে আগের অবস্থায় ফিরতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ আসে এই রাস লাফান হাব থেকে, ফলে এর প্রভাব পড়ছে চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতিতেও।
কাতার এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি এলএনজি ট্রেনের মধ্যে দুটি এবং একটি গ্যাস-টু-লিকুইড (জিটিএল) ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার ফলে বড় ধরনের আগুন লেগে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম। ইসরায়েল জানিয়েছে, সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে, আর ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়েছে। এতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকার আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ চেয়েছে। এর মধ্যে আইএমএফ থেকে ১.৩ বিলিয়ন এবং এডিবি থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বৈদেশিক আয়কে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশে এলএনজির উৎস
বাংলাদেশ যে এলএনজি আমদানি করে, তার ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ কাতার থেকে আমদানি করা হয়। অর্থাৎ মোট এলএনজি আমদানির ৫০ শতাংশ এসেছে কাতার থেকে, আবার কোনও কোনও বছর ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। এর বাইরে বাংলাদেশ ওমান থেকে স্থায়ি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি কেনে। বাকি এএন জি সিঙ্গাপুরের স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি কেনা শুরু করে। এরমধ্যে ২০১৭ সালে প্রথম দফায় কাতারের সঙ্গে এলএনজি সরবরাহের দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ওই চুক্তিতে বছরে কাতার বছরে ১.৮ মিলিয়ন টন থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহে রাজি হয়। এরপর ২০২৩ সালে কাতার পেট্রোবাংলার সঙ্গে আরও একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তিতে বছরে অতিরিক্ত আরও ১.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহে সম্মতি দেয় কাতার। বর্তমানে বাংলাদেশ সব মিলিয়ে কাতার থেকে বছরে ৩. ৬ থেকে ৪.৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশ বছরে সব মিলিয়ে ৬ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে। মোট আমদানির সঙ্গে কাতারের হিসাব করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এককভাবে সব চেয়ে বেশি এলএনজি কাতার থেকে কিনে থাকে।
অপরদিকে ২০১৯ সালে ওমান ট্রেডিংয়ের সঙ্গে এলএনজি আমদানির দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি করে বাংলাদেশ। ওই চুক্তি অনুযায়ী ওমান থেকে বছরে এক মিলিয়ন থেকে ১.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আসার কথা। পরবর্তীকালে ওমান বাংলাদেশের সঙ্গে আরেও একটি সম্পূরক চুক্তি করে। সেখানে বছরে শূন্য দশমিক ২৫ মিলিয়ন টন থেকে এক মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহে সম্মত হয় দেশটি। অর্থাৎ ওমান থেকে বাংলাদেশ চাইলে বছরে দেড় থেকে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করতে পারবে।
এর বাইরে পেট্রোবাংলা স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কিনে থাকে। গত বছরের হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদশে সব মিলিয়ে ১০৯ কার্গো এলএনজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৪৫ কার্গো কেনা হয়েছে স্পট মার্কেট থেকে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছে।
কেন দুটি স্থায়ী চুক্তি থাকার পরও স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়
কাতার এবং ওমানের সঙ্গে চুক্তিতে চাহিদার সমপরিমাণ এলএনজি’র জোগান থাকার পরও কেন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হয়, এমন প্রশ্নে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক সময় সরবরাহকালীন সময়কে বিবেবচনা করা হয়। যখন দেখা যায়, আমাদের এখানে চাহিদা রয়েছে, কিন্তু কাতার বা ওমান থেকে এলএনজি পাওয়া যাবে না, তখন স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়। এছাড়াও কোনও ওকোন সময় এলএনজি’র স্থায়ী চুক্তির চেয়ে স্পট মার্কেটে দাম কম পাওয়া যায়। ফলে সেই হিসাবেও স্পট মার্কেটকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কাতারের মতো বড় এলএনজি হাব যখন বন্ধ থাকবে, তখন স্পট মার্কেটে আর কম দামে এলএনজি পাওয়া যাবে না। কারণ কাতার থেকে যারাই এলএনজি কিনতো, তারা সবাই এখন স্পট মার্কেট থেকে কেনার চেষ্টা করবে। যেহেতু স্পট মার্কেটের দাম প্রতিদিন ওঠানামা করে, তাই যারাই এখানে বেশি দাম দেবে, তারাই বেশি এলএনজি পাবে। সেই বিবেচনায় এখন বাংলাদেশসহ যারাই স্পট মার্কেটে এলএনজি কিনতে যাবে, তাদেরই বাড়তি দাম গুণতে হবে।
ভর্তুকির চাপ বাড়ার আশঙ্কা
মার্চের শুরুর দিকে প্রতি মিলিয়ন বিট্রিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ছিল ১৫ থেকে ১৮ ডলার। কিন্তু ইরান সংকট শুরু হলে সমপরিমাণ এলএনজি’র দাম বেড়ে ২০ থেকে ২২ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। এখন যা ৩০ থেকে ৩৫ ডলারে উঠেছে। এদিকে তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে কাতার এবং ওমানের এলএনজি’র দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ এখন কাতার এবং ওমান থেকে গড়ে প্রতি মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করতে ব্যয় করতে হতো ১৪ ডলার। অর্থাৎ যদি কাতার থেকে গ্যাস সরবরাহ না পাওয়া যায়, তাহলে বছরে এলএনজি বাবদ সরকারের যে ভর্তুকি ছিল, তা বেড়ে দ্বিগুণ হবে। সরকার আগের মতো আর বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকি নির্ধারণ করে বাজেট করে না। তবে বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি দেওয়া হয়— এই টাকার অর্ধেকই ব্যয় হয় এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পেছনে।
ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে কী?
সাধারণত এ ধরনের চুক্তিগুলো দীর্ঘ মেয়াদী— ১০ থেকে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য করা হয়ে থাকে। চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করা যেমন সরবরাহকারীর জন্য বাধ্যতামূলক, আবার ক্রেতার জন্যও সরবরাহ নেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে অর্থপরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ধরনের চুক্তিতে ফোর্স মেজেউর বা অনিবার্য পরিস্থিতি বলে একটি ধারা থাকে। যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়লে যেকোনও পক্ষই এই সুবিধা নিতে পারে। ইরানের হামলায় কাতারের এলএনজি অবকাঠামো ধ্বংস হওয়াতে কাতার এনার্জি ফোর্স মেজর ডিক্লিয়ার করেছে। অর্থাৎ এলএনজি সরবরাহ করার ক্ষেত্রে তাদের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, এখন তারা সেটা থেকে মুক্তি পেয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশে এমন কোনও দুর্বিপাক ঘটলে বাংলাদেশও একই সুবিধা পাবে।
আশার দিক
যদি মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের হামলা না হয় এবং কাতার এক মাসের মধ্যে সরবরাহ পুনরায় চালু করতে পারে, তাহলে ক্ষতির মাত্রা কিছুটা সীমিত থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সীমিত সরবরাহ থেকেও সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, ‘‘আমরা আসলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়লাম। কাতারের রাস লাফানের ক্ষতি ঠিক হতে হতে ৫/৬ মাস লাগতে পারে। এরমধ্যে আমাদের এলএনজি পাওয়া মুসকিল। ফলে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। অস্ট্রেলিয়াসহ আশেপাশের দেশ থেকে আনা যেতে পারে, স্পট মার্কেট থেকে কেনা অথবা এরমধ্যে যদি কারও সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি করা যায়, তাহলে ভালো। তবে যাই করি না কেন ভর্তুকি বাড়বে। আর ভর্তুকি বাড়াতে না চাইলে দাম বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই। গ্যাস হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সেটা বেশি দামেই আমাদের কিনতে হবে।’’
এলএনজি আমদানির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কাতার এনার্জি বাংলাদেশের জন্য আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। এর পরবর্তী কার্গো সরবরাহের সময়সূচি ২৫ এপ্রিল নির্ধারিত করলেও সেটা বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সাতটি কার্গো বাতিল করেছে ফোর্স মেজরে।’’
তিনি জানান, এপ্রিল মাসে আমাদের গ্রীষ্ম ও সেচের জন্য বিদ্যুতে চাহিদা বেড়ে যায়৷ বিদ্যুতে গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যায়। সে চাহিদা পূরণ করতে হলে এখন আমাদের স্পট মার্কেটের বিকল্প নাই। আমরা ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলার স্পট থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা করছি। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে কারও সঙ্গে চুক্তি করা যায় কিনা, সে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে দীর্ঘ মেয়াদে আনা যায় কিনা, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আনতে ব্যয় বেড়ে যায়, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে টাকা চেয়েছি। স্পট থেকে আনতে গেলে খরচ বেশি এটা স্বাভাবিক। এবং এখন যে পরিমাণ এলএনজি আনতাম, সে পরিমাণ পাওয়া যাবে কিনা, তাও নিশ্চিত না।’’
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।