লামায় শিক্ষার্থীকে চড় মারার ঘটনাকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, শান্তিপূর্ণ সমাধান করল সেনাবাহিনী
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা উপজেলায় এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে চড় মারার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িতক সংঘাতের অপচেষ্টা ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে সংবেদনশীল রূপ নিলেও সময়োপযোগী পদক্ষেপে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ বুধবার (১ এপ্রিল) আনুমানিক দুপুর ১২টার দিকে লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের বছাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফরিদুল আলম (৫৩) প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী রেশমি ত্রিপুরা (৬.৫)-কে শারীরিকভাবে আঘাত করেন।
জানা গেছে, এর আগে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বর্ণমালা (A–Z) লিখে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করতে না পারায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়, যার মধ্যে রেশমিও ছিল।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে শিশুটির মুখ চেপে ধরেন এবং তাকে চড় মারেন, যার ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। যদিও অভিযুক্ত শিক্ষক চড় মারার বিষয়টি স্বীকার করেছেন, তবে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার পর রেশমি ত্রিপুরা বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি তার পিতা মাচি চন্দ্র ত্রিপুরা ও মাতা রজনী ত্রিপুরাকে জানায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিবারের সদস্যরা এবং স্থানীয় কিছু ব্যক্তি বিদ্যালয়ে গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করে। এ সময় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাথমিকভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় দ্রুত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে। সেনাবাহিনীর আলীকদম জোনের গজালিয়া আর্মি ক্যাম্প থেকে ক্যাপ্টেন আসলাম-এর নেতৃত্বে একটি টহল দল ঘটনাস্থল সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়।
পরবর্তীতে বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় প্রতিনিধিরা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অভিযুক্ত শিক্ষককে ওই বিদ্যালয় থেকে বদলির আশ্বাস দেন। এতে উপস্থিত সকল পক্ষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে বৈঠকের সমাপ্তি ঘটে।
বৈঠক শেষে ক্যাপ্টেন আসলাম-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর টহল দল ঘটনাস্থলসংলগ্ন পাড়ায় গিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় আশ্বাস প্রদান করে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়।
সেনাবাহিনীর এই দ্রুত, দায়িত্বশীল ও মানবিক পদক্ষেপ স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরা ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও তা কার্যকর হয়নি।
আলীকদম জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আশিকুর রহমান আশিক জানিয়েছেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও জননিরাপত্তা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদা সজাগ রয়েছে। লামার এই ঘটনাতেও সেনাবাহিনীর তাৎক্ষণিক উপস্থিতি, বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতার মাধ্যমে একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতির সফল সমাধান সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে এলাকায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং পুনরায় কোনো ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা নেই বলে প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।