প্রকৌশলী অর্জিন চাকমার দুর্নীতি: ৪০টি ওয়াশব্লকের কাজ না করেই বিল ভাগবাঁটোয়ারা

প্রকৌশলী অর্জিন চাকমার দুর্নীতি: ৪০টি ওয়াশব্লকের কাজ না করেই বিল ভাগবাঁটোয়ারা

প্রকৌশলী অর্জিন চাকমার দুর্নীতি: ৪০টি ওয়াশব্লকের কাজ না করেই বিল ভাগবাঁটোয়ারা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

কুমিল্লার দেবিদ্বারে জনস্বাস্থ্যের সহকারী প্রকৌশলী অর্জিন চাকমার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ৪০টি ওয়াশব্লকের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঠিকাদারদের সঙ্গে বিলের টাকা ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন এই প্রকৌশলী। গত ১১ বছর ধরে একই স্টেশনে থেকে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। এদিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকায় ওয়াশব্লকের (স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও স্যানিটেশন সুবিধা) কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বরাদ্দের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ায় এসব প্রকল্প মুখথুবড়ে পড়েছে। এরই মাঝে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখিতভাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলায় ২০২৩ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬০টি ওয়াশব্লক নির্মাণের বরাদ্দ আসে। প্রতিটি ওয়াশব্লক নির্মাণের জন্য ১৪-১৫ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে ঠিকাদার সিন্ডিকেট ২০টি ওয়াশব্লকের কাজ কোনোরকম সম্পন্ন করে। প্রকৌশলী অর্জিন চাকমার যোগসাজশে ৪০টি ওয়াশব্লকের কাজ অসম্পন্ন রেখেই বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়। তাছাড়া গত ১১ বছরে আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল, গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন প্রকল্পের নামমাত্র কাজ দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে দেবিদ্বার উপজেলায় দুটি প্রকল্পের আওতাধীন বিভিন্ন বিদ্যালয়ে মোট ৬০টি ওয়াশব্লকের বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২ বছরে ২০টি ওয়াশব্লকের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ৪০টি ওয়াশব্লকের কাজ অসম্পন্ন রেখেই উপজেলা জনস্বাস্থ্যের সহকারী প্রকৌশলী অর্জিন চাকমা ও ঠিকাদার সিন্ডিকেট মিলে বিল উত্তোলন করে নেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই প্রকল্প থেকে প্রায় চার কোটি টাকা লুট করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার উজানিজোড়া, ঘোষঘর, সংচাইল, চাষারপাড়, কামারচর, আশানপুর, বড়শাঘর, নারায়ণপুর, উনঝুটি, পদুয়া, ইউসুফপুর পূর্বপাড়া, মহেশপুর পূর্বপাড়া, পদ্মকোট, চন্দ্রনগর, বাকসার, প্রজাপতি, ফতেহাবাদ, তেবাড়িয়া, শুভপুর, বিষ্ণুপুর, ফতেহাবাদ দক্ষিণ, যুক্তগ্রাম, অনন্তপুর, বাংগুরী পূর্বপাড়া, ধামতী মাদ্রাসাপাড়া, গণেশপুর, বল্লভপুর, কাঁশারিখোলা, নোয়াকান্দি, বেতুয়া, বড়শালঘর, ফতেহাবাদ, ভিংলাবাড়ী দক্ষিণ, বিজলীপাঞ্জার, হাদিপুর বড়শালঘর এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন ওয়াশব্লকের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বিলের টাকা ভাগবাঁটোয়ারা করে নেওয়া হয়। এরই মাঝে দুর্নীতিবাজ ওই প্রকৌশলীর অনিয়মের বিষয়গুলো নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এতে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, সৈকত কনস্ট্রাকশনের নামে ২৪টি, সিয়াম ট্রেনিং করপোরেশনের নামে ৩টি, রাতুল এন্টারপ্রাইজের নামে ৩টি, রুদ্র কনস্ট্রাকশনের নামে ৩টি, সরকার এন্ড সন্সের নামে ৩টি, এফ এ কনস্ট্রাকশনের নামে ৩টি, রানা কনস্ট্রাকশনের নামে ১টি ওয়াশব্লক নির্মাণাধীন রেখেই বিল তুলে নেওয়া হয়। তবে এসব ঠিকাদারের কোনো হদিস না মেলায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে উপজেলার সাবের পুকুরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একটি ওয়াশব্লকের ৫০ শতাংশ কাজ হয়েছে। তারপর ঠিকাদার বিল নিয়ে চলে গেছেন।

ফাতেহাবাদ এম আহাম্মাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একটি ওয়াশব্লকের ৫০ শতাংশ কাজ হয়েছে। ওই প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করা হয়ে গেছে। উপজেলার বড়শালঘর মোশাররফ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একটি ওয়াশব্লকের ৪০ শতাংশ কাজ করার পর ঠিকাদার চলে গেছে। কাজ সম্পন্ন না করেই যোগসাজশে ওই প্রকল্পের বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে।

উপজেলার ধামতী এলাকার জালাল উদ্দিন ও আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের এলাকায় প্রাইমারি স্কুলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে একটি ওয়াশব্লক বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে কাজ শুরু করেই বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়। ইউসুফপুর এলাকার কবির হোসেন বলেন, শুনেছি একটি ওয়াশব্লকের বরাদ্দ এসেছে। কিছু কাজ করে শুনলাম বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। পুনরা এলাকার আব্দুল হাকিম বলেন, ওয়াশব্লকের সামান্য কাজ করে ঠিকাদার চলে গেছে। গত দুই বছর যাবৎ এভাবেই এটি পড়ে আছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকৌশলী অর্জিন চাকমা বলেন, আমাদের অফিসের কিছু লোক আমার পেছনে লেগেছে। তারাই বিভিন্ন জায়গায় তথ্য ফাঁস করছে। আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। ওয়াশব্লকের কাজ অসম্পূর্ণ থাকলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ডাকা হবে।

দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম বলেন, জনস্বাস্থ্যের সহকারী প্রকৌশলী অর্জিন চাকমার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওয়াশব্লকের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই বিলের টাকা ভাগবাঁটোয়ারার বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *