বর্ষবরণ উৎসব ঘিরে ছিলো অশান্তির আশঙ্কা, সেনাবাহিনীর তৎপরতায় পাহাড়জুড়ে স্বস্তি
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চলতি এপ্রিল মাসজুড়ে উদযাপিত ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ ও সামাজিক উৎসবগুলো এবছর সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। অতীতে উৎসবকে কেন্দ্র করে অশান্তির শঙ্কা থাকলেও, চলতি বছর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সমন্বিত উদ্যোগে সেই আশঙ্কা পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রতি বছরের মতো এবারও ১২ এপ্রিল ফুল বিজুর মধ্য দিয়ে পাহাড়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও, বাস্তবে এপ্রিলের শুরু থেকেই বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। তবে বিগত বছরগুলোতে এই সময়কে ঘিরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল নানা অপপ্রচার ও উসকানির মাধ্যমে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে এবছর শুরু থেকেই কঠোর ও সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করে সেনাবাহিনী।
উৎসব শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের সামনের সড়কে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের এক অভিযানকে কেন্দ্র করে শুরু হয় জাতিগত উসকানি। ফেসবুকে অব্যাহতভাবে ছড়ানো হয় অপপ্রচার, আর তার হাওয়া লাগে বর্ষবরণ উৎসবের আমেজে। লক্ষ্য ছিলো উসকানি দিয়ে পুরো পাহাড়জুড়ে সহিংসতা ছড়ানো। ঠিক তখনি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহন করে সেনাবাহিনী।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০৩ পদাতিক ব্রিগেড ও খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হকের নেতৃত্বে গত ৫ এপ্রিল রিজিয়ন সদর দপ্তরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, উৎসব উদযাপন কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, উৎসবকে ঘিরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, বাংলা নববর্ষের পাশাপাশি পাহাড়ের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ণিল সামাজিক উৎসবগুলো নির্বিঘ্ন ও আনন্দঘন করতে সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা কুচক্রী মহল যদি উৎসবের পরিবেশ নষ্টের চেষ্টা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ওই সভায় জানানো হয়, অতীতের মতো এবারও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকরা বৈসাবির আনন্দকে বিঘ্নিত করতে নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাতে পারে। এ ধরনের অপতৎপরতা প্রতিহত করতে স্থানীয় সামাজিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক নেতৃবৃন্দের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন উপস্থিত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। উৎসব চলাকালে পাড়া-মহল্লার মেলা ও আয়োজনগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার পাশাপাশি সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানান রিজিয়ন কমান্ডার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয় এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়। খাগড়াছড়ি সদর, মহালছড়ি, পানছড়ি, দীঘিনালা এবং রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়। সেনাবাহিনীর টহল বৃদ্ধি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ফলে সম্ভাব্য অপতৎপরতা আগেভাগেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎসবের আমেজ ধরে রাখতে সেনাবাহিনী বিভিন্ন উৎসব উদযাপন কমিটির মাঝে আর্থিক সহায়তা ও উপহার সামগ্রী বিতরণ করে।
এছাড়া সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেনাবাহিনী স্থানীয় জনগণের পাশে থাকার দৃঢ় বার্তা পৌঁছে দেয়।
উৎসব সংশ্লিষ্ট আয়োজক ও স্থানীয় জনগণ সেনাবাহিনীর এই ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য মংনো মারমা বলেন, সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় এবারের সাংগ্রাই উৎসব অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাদের উপস্থিতি ও আন্তরিকতায় উৎসবের আনন্দ আরও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, বৈসু উৎসব নির্বিঘ্নে আয়োজন করতে সেনাবাহিনী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। বিশেষ করে মহালছড়ি এলাকায় তীর্থ অনুষ্ঠানে তাদের সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয়দের মতে, সেনাবাহিনীর এই সমন্বিত ও মানবিক উদ্যোগের ফলে শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, বরং পাহাড়ে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে যে শঙ্কা ও আতঙ্ক আগে বিরাজ করত, এবছর তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে উৎসবের সময় নিরাপত্তা ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়ে আসলেও, চলতি বছরের সফল ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়নের পথ আরও সুগম হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।