স্কুলে না গিয়ে বেতন নিচ্ছেন আলীকদমের তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকরা, ক্ষোভ স্থানীয়দের
![]()
নিউজ ডেস্ক
বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদমে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে স্থানীয় পাড়াবাসী ও অভিভাবকরা। অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয় থাকলেও দেখা মিলছেনা শিক্ষকের। ঝরে পড়ছে শিশুরা। স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গেলে, অভিভাবকরা ক্ষোভ ঝাড়লেন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। তারা জানান, সন্তানদেরকে বিদ্যালয়ে পাঠাই। কিন্তু বিদ্যালয়ে কোন শিক্ষক থাকেনা। বই হাতে নিয়ে বিদ্যালয়ে যায়, কিছুসময় খেলাধুলা করে চলে আসে।
২০১০ সালে ইউএনডিপির অর্থায়নে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে আলীকদম উপজেলায় বিশটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। বিদ্যালয়গুলো ২০১৭ সালে জাতীয়করণ করা হলেও শিক্ষকদের অবহেলায় শিক্ষা বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে এলাকার শিশুরা।
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের একটি দল সরেজমিনে উপজেলার ৪নং কুরুকপাতা ইউয়িনের কমচঙ ইয়ুংছা মাওরুম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খিদু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রাংলাই দাংলি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে।
দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোতে কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও নেই কোন শিক্ষক। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে বর্গা শিক্ষক (অস্থায়ী) দিয়ে সেরে নেয়া হচ্ছে বিদ্যালয়ের নথিপত্র আপডেট করার কাজ।

বর্গা (অস্থায়ী) শিক্ষক দিয়ে নিয়ম করে বিদ্যালয় খোলা রাখলেও শ্রেণী কার্যক্রমের কোন বালাই নেই বিদ্যালয়গুলোতে। অথচ প্রতি মাসে নিয়ম করে বেতন ভাতা নিচ্ছেন শিক্ষকরা। শ্রেণী কক্ষে প্রতিটি টেবিল চেয়ারে দুলো জমে আছে। এবিষয়ে ঠুটো জগন্নাথের ভূমিকায় রয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস। অভিযোগ রয়েছে প্রতি মাসে শিক্ষা অফিসারকে নির্ধারিত টাকা দিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষকরা।
এবিষয়ে কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা বললে তারা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। খিদু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোঃ নাঈম বলেন, ‘বিদ্যালয়গুলো অনেক দুর্গম এলাকায় হওয়ায় বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না।আমার বন্ধু পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এর পিএস। আমার সাথে কথা হয়েছে আমি বদলি নিয়ে চলে যাবো।’
শিক্ষক আরিফ বিল্লাহকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, আমি ইদের পরে একবার গিয়ে রাতে থেকে পরের দিন চলে আসি। অন্যদিকে রাংলায় দাংলি পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নুক্যএ মং তিনি মোবাইল ক্যাসিনো খেলতে ব্যস্থ।
ভোলায় পাড়ার এক অভিভাবক বলেন, বিগত তিন মাস ধরে শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে আসেন না। তারা দুই-তিন মাসে একবার আসেন, একদিন থেকে চলে যান। তাহলে আমরা কীভাবে আমাদের সন্তানদের মানুষ করব? পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে যদি অন্তত দুইজনও ১০ দিন করে নিয়মিত ক্লাস নেন, তাতেও আমাদের আপত্তি নেই। যেখানে সরকার শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্কুল তৈরি করছে, সেখানে সেই স্কুলই যেন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এখানে স্কুল রেখে কোনো লাভ নেই।

খিদু পাড়ার বাসিন্দা তুমলন ম্রো বলেন, শিক্ষকরা স্কুলে নিয়মিত আসেন না। বছরে মাত্র তিনবার এসেছেন। এখানে স্কুলেরও প্রয়োজন নেই। আর শিক্ষকদের চাকরি করার কোনো দরকার নেই। তাদের শাস্তি হওয়া উচিত—এটাই আমাদের দাবি।
মংচিং হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আবচার বলেন, ‘আলীকদমে প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ভালো না। কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। যার ফলে যারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন ও পাঠদান করেন, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা চাই, সদ্য ইউএনডিপির অধীনে থাকা যে স্কুলগুলো সরকারি করা হয়েছে, সেগুলোর শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকবেন এবং নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। তাদের অবহেলার কারণে আমাদের সম্মান নষ্ট হচ্ছে।’
আলীকদমের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুল আলম বলেন, যেসব শিক্ষক নিয়মিত স্কুলে না গিয়ে বেতন নিচ্ছেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। তাদের সতর্ক করা হয়েছে—নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হলে বেতন বন্ধ করা হবে। অভিযোগে উল্লিখিত অতীতে কেউ স্কুলে না গিয়ে বেতন নিয়ে থাকলে, তা ফেরত নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হবে।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ৬–৭টি স্কুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ রয়েছে—শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছেন না এবং বর্গা শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। তথ্য যাচাই করে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, এর আগে ১৩ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে জেলা পরিষদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নতুন করে যেসব তিনটি স্কুলের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোও সমন্বিতভাবে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। দুর্গম এলাকার কারণে অনেক স্কুলে যেতে ২–৩ ঘণ্টা সময় লাগে, যা মনিটরিং কঠিন করে তোলে। শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে না গেলে তাদের বেতন বন্ধসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।