নেপিদোতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর দ্রুত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
![]()
নিউজ ডেস্ক
চীনের অব্যাহত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের প্রতিশ্রুতির পর মিয়ানমারের নতুন ছদ্ম-বেসামরিক সরকারের সঙ্গে বেইজিংয়ের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার নেপিদোতে মিয়ানমারের উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়ো সাওয়ের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন চীনের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মা জিয়া।
চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর (CMEC), যা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৈঠকে নিয়ো সাও এই করিডোরের নির্মাণকাজ দ্রুততর করা, চীনা প্রকল্প ও কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন।
দুই পক্ষের মধ্যে যৌথ অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বানটি এপ্রিলে নেপিদোতে অভ্যুত্থান নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর আলোচনার বক্তব্যের প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার নিয়ো সাও ও মা জিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সীমান্তভিত্তিক অনলাইন প্রতারণা চক্র দমনে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেন।
রাষ্ট্রদূত মা জিয়া পৃথকভাবে মিয়ানমারের উপ-রাষ্ট্রপতি ন্যান নি নি আয়ে, নিম্নকক্ষের স্পিকার খিন ই এবং উচ্চকক্ষের স্পিকার আউং লিন দোয়েসহ শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অনলাইন প্রতারণা বিরোধী ব্যাপক আইন প্রণয়ন এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়গুলো উঠে আসে।
নিয়ো সাও মিয়ানমারের অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি পূর্বে সেনাবাহিনীর বৃহত্তম অর্থনৈতিক কর্পোরেশন মিয়ানমার ইকোনমিক কর্পোরেশন-এর চেয়ারম্যান এবং মিন অং হ্লাইংয়ের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই বৈঠকগুলো এমন সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন কয়েক সপ্তাহ আগেই মিন অং হ্লাইং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সফরের সময় CMEC প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
CMEC চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি প্রধান অংশ, যার লক্ষ্য মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এই করিডোরে প্রায় ৩৫টি অবকাঠামো প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যের কিউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পাশাপাশি ইয়াঙ্গুন, মান্দালয়, কাচিন ও শান রাজ্যে বিভিন্ন প্রকল্প।
রাখাইন রাজ্যের কিউকফিউ প্রকল্প এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির (AA) মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। AA বর্তমানে রাখাইনের ১৭টির মধ্যে ১৪টি উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের পালেতাওয়া উপজেলা নিয়ন্ত্রণ করছে।
অন্যদিকে, চীনের ইউনান প্রদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর শান রাজ্যের CMEC করিডোরের অপর প্রান্তে বেইজিংয়ের চাপের ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
একই সময়ে মিন অং হ্লাইং পিয়িন উ লুইনে সড়ক ও বিমানবন্দর উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা মুসে-মান্দালয়-কিউকফিউ রেলপথ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচিত।
যদিও চীনের মধ্যস্থতায় উত্তর শান রাজ্যে সাময়িকভাবে সংঘাত থেমেছে, তবুও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্য রুটগুলো এখনো জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (MNDAA)-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শান্তি চুক্তি থাকলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে উত্তর ও পূর্ব শান রাজ্যের ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (UWSA), তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (TNLA) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (NDAA) মিন অং হ্লাইংয়ের নতুন প্রশাসনের প্রতি সমর্থন জানালেও MNDAA এখনো সেই অবস্থান নেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সমাধান না হলে যেকোনো সময় আবারও সংঘাত শুরু হতে পারে।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চললেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন—উত্তর শানে MNDAA গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং রাখাইনে CMEC করিডোরের সামুদ্রিক প্রবেশপথের অধিকাংশ শহর আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।