সাইবার জালিয়াতি দমন: আরও দুই ভবন গুঁড়িয়ে দিল মিয়ানমার জান্তা
![]()
নিউজ ডেস্ক
থাই সীমান্তঘেঁষা কুখ্যাত সাইবার জালিয়াতি কেন্দ্রগুলো ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর মিয়ানমারের সামরিক-নিয়ন্ত্রিত সরকার সোমবার ঘোষণা দিয়েছে, তারা শ্বে কোক্কো এলাকায় আরও দুটি ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে জান্তা সরকার এবং তাদের মিত্র কারেন বর্ডার গার্ড ফোর্স (বিজিএফ) একটি ১৩ তলা ভবন ধ্বংস করেছিল।
তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এসব বিচ্ছিন্ন ভবন ধ্বংস আসলে আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশলমাত্র, অথচ বহু বিলিয়ন ডলারের সাইবার প্রতারণা শিল্প আগের মতোই চালু রয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে জান্তা বাহিনী মিয়াওয়াদ্দি টাউনশিপের সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্রে অবস্থিত বিজিএফ নিয়ন্ত্রিত আরেকটি সাইবার জালিয়াতি ঘাঁটি কেকে পার্কে অভিযান চালায়। সে সময় সরকার দাবি করেছিল, তারা পুরো জালিয়াতি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছে, ৬৩৫টি ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে, দুই হাজার প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে এবং কয়েক হাজার যোগাযোগযন্ত্র জব্দ করেছে।
পরবর্তী নভেম্বরে নজর যায় শ্বে কোক্কোর দিকে। বিজিএফ তখন “সাইবার প্রতারণার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ” ঘোষণা দিয়ে দুই ধাপে ৭৭টি ভবন ধ্বংসের পরিকল্পনার কথা জানায়। কিন্তু কেকে পার্কের মতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বদলে গত পাঁচ মাসে শ্বে কোক্কোতে মাত্র তিনটি ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, এই পার্থক্যের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। এক স্থানীয় পর্যবেক্ষক দ্য ইরাবতীকে বলেন, “শ্বে কোক্কো প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এলাকা থেকে অনেক দূরে হওয়ায় জান্তা ও বিজিএফের সেখানে থাকা জালিয়াতির প্রমাণ বিদ্রোহীদের হাতে যাওয়ার ভয় নেই। কিন্তু কেকে পার্ক প্রতিরোধ বাহিনীর অপারেশন এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় তারা দ্রুত সব প্রমাণ মুছে ফেলতে চেয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, বাইরের চাপ না থাকলে জান্তা সরকার শ্বে কোক্কোর অবকাঠামো ধ্বংসে আগ্রহ দেখাবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানের বেশিরভাগই লোক দেখানো। সাইবার জালিয়াত চক্রগুলো সীমান্ত থেকে আরও ভেতরের দিকে সরে গেছে অথবা আবাসিক এলাকায় ছোট ছোট নেটওয়ার্কে বিভক্ত হয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধবিরোধী গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ জেসন টাওয়ার দ্য ইরাবতীকে বলেন, জান্তা সরকারের সাইবার জালিয়াতি দমনে “কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই”, কারণ সরকার-সমর্থিত বিজিএফের ভেতরে ও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের ব্যক্তিরা এই ব্যবসা থেকে এখনও লাভবান হচ্ছেন।
তিনি বলেন, সামরিক বাহিনী যদি সত্যিকার অর্থে জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বিজিএফের পক্ষ থেকে “গুরুতর বিদ্রোহের হুমকি” তৈরি হতে পারে।
জেসন টাওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের অভিযানের পরও শ্বে কোক্কোতে সাইবার জালিয়াত চক্রগুলো নতুন কর্মী নিয়োগ ও আর্থিক সেবার বিজ্ঞাপন দেওয়া পুনরায় শুরু করেছে, যা প্রমাণ করে যে ওই এলাকায় অপরাধমূলক কার্যক্রম এখনও বহাল রয়েছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া এসব চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
গত ১৩ মে জান্তা সরকার একটি খসড়া সাইবার প্রতারণাবিরোধী আইন প্রকাশ করে, যেখানে জরিমানা থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এমনকি ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই আইনি পদক্ষেপকেও জনসংযোগমূলক প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন। তাদের দাবি, জান্তা সরকার নিজেই এই সাইবার জালিয়াতি কার্যক্রম থেকে লাভবান হচ্ছে, যেখানে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম ও নির্যাতনের মাধ্যমে এসব চক্র পরিচালনা করছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।