প্রধানমন্ত্রী সফরেই বেল্ট অ্যান্ড রোড পরিকল্পনা স্বাক্ষর চায় চীন, ঢাকায় পাঠানো হয়েছে খসড়া
![]()
নিউজ ডেস্ক
আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা দ্রুত ও আরও গভীর করতে দৃশ্যমান কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে চীন। চলতি জুনে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। এ সময়ই একটি বিস্তৃত সহযোগিতা পরিকল্পনা স্বাক্ষরের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে দেশটি। ইতোমধ্যে চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন (এনডিআরসি) প্রস্তাবিত বিস্তারিত একটি খসড়া বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে ওই প্রস্তাবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চীনা পক্ষ সরাসরি যোগাযোগ করে এই পরিকল্পনাটি দ্রুত চূড়ান্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি খসড়ার প্রথম সংস্করণে কিছু প্রস্তাবে আপত্তি তোলার পর সংশোধিত সংস্করণ পাঠানো হয়েছে, যা থেকে বিষয়টি নিয়ে বেইজিংয়ের উচ্চপর্যায়ের মনোযোগ ও আগ্রহ প্রতিফলিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে চীন এই পরিকল্পনাটিকে একটি বড় কূটনৈতিক ‘আউটকাম’ হিসাবে দেখতে চায়।
জানা গেছে, ‘চীনের প্রস্তাবিত’ এই সহযোগিতা পরিকল্পনাটি ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরে বিআরআই-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় তৈরি হয়েছে। তবে এর পরিসর ও গভীরতা আগের যে কোনো উদ্যোগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। যদিও এটি আইনগত বাধ্যবাধকতাহীন একটি নীতিগত দলিল; তবুও এতে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো ভবিষ্যতে বড় অর্থনৈতিক চুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
খসড়ায় মোট ২৩টি সহযোগিতা ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা তিনটি কাঠামোয় বিন্যস্ত। এগুলো হচ্ছে-সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম, সহযোগিতা প্রক্রিয়া এবং সহায়ক নীতি। এই কাঠামোর মাধ্যমে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ উন্নয়ন, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামুদ্রিক সহযোগিতা, অবকাঠামো এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মের অংশ হিসাবে বাংলাদেশকে চীনের প্রধান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ও প্রদর্শনীতে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ইমপোর্ট এক্সপো, চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার এবং চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোজিশন উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স ফোরাম আয়োজন, বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষা ফোরাম পরিচালনা, থিংকট্যাংক ও গবেষকদের মধ্যে ধারাবাহিক মতবিনিময় এবং সামুদ্রিক সহযোগিতা সংলাপের মতো উদ্যোগ রাখা হয়েছে। চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য যৌথ কমিশনের বৈঠক নিয়মিত করার বিষয়টিও প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
সহযোগিতা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে একটি স্থায়ী সমন্বয় কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি বাস্তবায়ন পর্যায়ে দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত করবে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে (কম্পিউটার ও ইন্টারনেটে উন্নত সেবা) সহযোগিতা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে আলাদা সমন্বয় ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। কৃষি খাতে হাইব্রিড ধান ও গম উন্নয়ন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং গবেষণা সহযোগিতাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হিসাবে খসড়ার সহায়ক নীতিতে একাধিক বড় অর্থনৈতিক ও আর্থিক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামোই বদলে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে চীন-বাংলাদেশ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু, বিদ্যমান বিনিয়োগ চুক্তি হালনাগাদ, দুই দেশের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ), ব্যাংকিং ও আর্থিক সহযোগিতা জোরদার এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো। একই সঙ্গে উভয় দেশে ব্যাংক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো ও প্রকৌশল খাতে গভীর সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে খসড়া প্রস্তাবে।
খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে, পরিকল্পনাটি স্বাক্ষরের পর অনির্দিষ্টকাল কার্যকর থাকবে, তবে এটি কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে না। যে কোনো পক্ষ ছয় মাস আগে নোটিশ দিয়ে সরে আসতে পারবে। তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং মতবিরোধ হলে তা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির কথাও বলা হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই খসড়া চূড়ান্ত করে স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি চীনের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত বার্তা বহন করে। এতে বোঝা যায়, বিআরআই কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে বেইজিং সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে সংশ্ল্নিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত মুক্তবাণিজ্য, মুদ্রা বিনিময় এবং ব্যাংকিং সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিষয়ে কিছু প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। তাই এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, খসড়াটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে পাঠানো হয়েছে। এখন এর বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে এটি চূড়ান্ত করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বিআরআই উদ্যোগে যুক্ত হওয়া নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মূল বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের নিজের প্রস্তুতি নেওয়া। কোন খাতে বিনিয়োগ দরকার, সেই বিনিয়োগ থেকে রিটার্ন কীভাবে আসবে এবং ঋণ নিলে তা কীভাবে পরিশোধ করা হবে; এই ‘হোমওয়ার্ক’ বাংলাদেশকেই করতে হবে।
তিনি বলেন, অবকাঠামো, হাইস্পিড রেল, স্বাস্থ্য বা শিক্ষা-যে খাতেই প্রকল্প নেওয়া হোক না কেন, সেগুলোকে কীভাবে দেশের জন্য লাভজনক করা যাবে, সেটাই মূল বিষয়। উদাহরণ হিসাবে স্বাস্থ্য খাতের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনো চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরশীল। অথচ ভিসা জটিলতার কারণে অনেকেই চিকিৎসা নিতে পারছে না; যা কাম্য নয়। এই জায়গায় বিদেশি সহযোগিতা, বিশেষ করে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব। বিআরআই নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব সমালোচনার বড় একটি অংশ রাজনৈতিক এবং সব দেশের বাস্তবতাও এক নয়। বিআরআই থেকে ইতালির সরে যাওয়ার বিষয়টি ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত, বাংলাদেশের সঙ্গে তা তুলনীয় নয়।
ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশ যদি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করে এবং দরকষাকষিতে দৃঢ় থাকে, তাহলে বিআরআই-এর মতো উদ্যোগ থেকে লাভবান হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।