বিজিবি ও বিএসএফের বৈঠকের পরও থামছে না পুশইন, শঙ্কায় সীমান্তবাসী
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্য রেখায় (জিরো লাইনে) অনাকাঙ্ক্ষিত পুশইন ইস্যু নিয়ে কিছুতেই কাটছে না চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সীমান্তরক্ষী দুই বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের সাম্প্রতিক বৈঠকে সাময়িক স্বস্তির বার্তা মিললেও, বাস্তবে সীমান্ত পরিস্থিতির কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি।
দিল্লির আলোচনার টেবিলে সমঝোতার প্রতিশ্রুতির পরও মাঠপর্যায়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আগ্রাসী ও অনৈতিক মনোভাব অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিবিদের ভারত সুবিধা দিয়েছে, তা সবার জানা। তাই আঞ্চলিক বহুমাত্রিক যোগাযোগ চ্যানেলগুলোকে দ্রুত সক্রিয় করতে হবে।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার (৯ জুন) গভীর রাতেও লালমনিরহাটের দুর্গাপুর সীমান্তে আলো নিভিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। তবে সীমান্তবাসীর কঠোর সতর্কতা এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতন্দ্র প্রহরার মুখে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী বিএসএফের সেই রাতের মিশন ব্যর্থ হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় সহায়তায় এই পুশইন প্রতিহত করে বিজিবি।
এ ঘটনার পর থেকে লালমনিরহাটসহ রংপুর বিভাগের দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে চরম উত্তেজনা ও শঙ্কা বিরাজ করছে। এই নিয়ে রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় ২০০-এর বেশি মানুষকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার অংশে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে এই কাঁটাতারবিহীন দীর্ঘ সীমান্তের একটি বড় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ পড়েছে রংপুর বিভাগের ছয়টি সীমান্ত জেলায়। সেগুলো হলো লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও নীলফামারী।
দীর্ঘদিন ধরে এসব জেলার অরক্ষিত সীমান্ত ফাঁকি দিয়ে চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর এই নতুন ‘পুশইন’ কৌশল সীমান্তবাসীর মনে ভীতি ও নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
গত এক সপ্তাহে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের ২১টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর পয়েন্ট দিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালায় বিএসএফ, যা বিজিবি ও স্থানীয়দের প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। ফলে বর্তমানে পুরো উত্তর জনপদের সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক পাহার মোতায়েন করা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, দিল্লির শীর্ষ বৈঠকের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত দেখালেও ভেতরের শঙ্কা কমেনি। তারা চান আলোচনার টেবিলেই যেন এর একটি স্থায়ী ও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান বের করা হয়। একই সঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির জনবল, আধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম এবং সামগ্রিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাঠপর্যায়ের বিজিবি কর্মকর্তারা বলছেন, পুশইনের মতো যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা বর্তমানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছেন। তবে বিশাল সীমান্ত এলাকার বিপরীতে লোকবল সংকট, আধুনিক নাইট ভিশন প্রযুক্তির অভাবসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এই বৈরী আবহাওয়া ও রাতের অন্ধকারে দায়িত্ব পালনে তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
এই সংকটের গভীরতা নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম শফিকুর রহমান। মুঠোফোনে তিনি জানান, বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে এবং স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো অপতৎপরতা রুখে দিতে প্রস্তুত। তবে মাঠপর্যায়ের শক্তির পাশাপাশি এর একটি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
এস এম শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘আমাদের এখন বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কারণ সরকারি বাজেট অনুযায়ী সরকারি কাজ পরিচালনা করতে হয়। এর মধ্যেও যেহেতু বর্তমানে সীমান্তে পুশইন চলছে, তাই এগুলোকে আমাদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। সীমান্তের অনেক বিষয় সব সময় সহজে নজরে আসে না। তবু যেখানেই পুশইন হচ্ছে, সেখানেই বিজিবি তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছে। সীমান্ত এলাকায় কোনো বড় রাস্তা বা যোগাযোগব্যবস্থা নেই; বিজিবি সদস্যদের ফসলি জমি ও জলাশয়ের মধ্য দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে অভিযান চালাতে হয়।’
প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু সার্ভেইল্যান্স টেকনোলজি ও ড্রোন রয়েছে, তবে তা পুরো সীমান্ত এলাকা ঢেকে ফেলার (কভার করার) জন্য পর্যাপ্ত নয়। আমাদের একেকটি বিওপি থেকে অন্যটির দূরত্ব প্রায় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত। আর প্রতিটি বিওপিতে সদস্য থাকে মাত্র ২০ থেকে ৩০ জন। ফলে একদিকের অভিযানে ফোর্স পাঠালে অন্যদিকটা ফাঁকা হয়ে যায়। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সীমান্তজুড়ে ২৪ ঘণ্টা টহল বজায় রেখেছি।’
গ্রামবাসীর সহায়তা পাচ্ছেন জানিয়ে রংপুর সেক্টর কমান্ডার বলেন, ‘তবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা। তাদের সহায়তায় এসব অভিযান সফল করতে পারছি। এলাকার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া পুশইন ঠেকানো কখনোই সম্ভব হতো না। এ বিষয়ে সরকারও যথেষ্ট সহযোগিতা করছে এবং আশা করি এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে। তবে পুশইনসহ কোনোভাবেই বাংলাদেশে কাউকে অবৈধ অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’
দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই পুশইন তৎপরতাকে অত্যন্ত গভীর ও উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত এবং প্রভাবশালী বেশ কিছু রাজনীতিবিদের ভারত যেভাবে আশ্রয় ও রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে, তা সবার জানা। অথচ সম্পূর্ণ বিপরীত ও বৈষম্যমূলক আচরণ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে অত্যন্ত অসহায়, দরিদ্র বাংলাভাষী মুসলিমদের রাতের আঁধারে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।
ভারতের এই স্ববিরোধী নীতিকে চরম ‘দ্বিচারিতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মুঠোফোনে বলেন, পরিস্থিতির স্থায়ী উত্তরণে কেবল বিজিবি-বিএসএফের প্রথাগত সংলাপ যথেষ্ট নয়। কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক বহুমাত্রিক যোগাযোগ চ্যানেলগুলোকে দ্রুত সক্রিয় করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে দুই পাশের হিউম্যান রাইটস (মানবাধিকারকর্মী), ব্যবসায়ীসহ মিডিয়ার যেসব ট্র্যাক বা মাধ্যম রয়েছে, সেগুলোকে সক্রিয় করতে হবে; তাহলেই আমরা একটি সুনির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে পারব। এই পুশইন ভারতীয় জনগণকেই থামাতে হবে। ইতোমধ্যে কিছুটা প্রক্রিয়া শুরুও হয়ে গেছে, যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক বা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে কাজ করেন, তারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
তবে এটি আরও বড় আকারে করা সম্ভব জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, কারণ (পুশইনের মাধ্যমে) সেখানে একটি সংবিধান পরিপন্থি ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। আর এটি বিশ্বাস করতে হবে যে এর ফলে একসময় দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় আঘাত আসবে। তাই এমনভাবে কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন ভারতীয় নাগরিকরাই পুশইন থামানোর জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া দুই দেশের যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রয়েছে, তারা যদি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, তবে এই সমস্যার একটি টেকসই সমাধান মিলবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল বলেন, ভারত মূলত দ্বিপক্ষীয় সব চুক্তি, আন্তর্জাতিক আইন এবং প্রটোকল ভেঙে রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে চাইছে। রাতের অন্ধকারে অসহায় মানুষকে পুশইন করা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। এটি শুধু একটি সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং এর পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির প্রয়াস রয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।