বান্দরবানে শ্রমবাজার দখল করছে রোহিঙ্গারা, কাজ হারানোর শঙ্কায় স্থানীয় শ্রমিকরা

বান্দরবানে শ্রমবাজার দখল করছে রোহিঙ্গারা, কাজ হারানোর শঙ্কায় স্থানীয় শ্রমিকরা

বান্দরবানে শ্রমবাজার দখল করছে রোহিঙ্গারা, কাজ হারানোর শঙ্কায় স্থানীয় শ্রমিকরা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পুলিশ ও প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কম মজুরিতে কাজ করায় নির্মাণ, কৃষি, বাগান ও বিভিন্ন শ্রমনির্ভর খাতে ক্রমেই রোহিঙ্গা শ্রমিকদের ব্যবহার বাড়ছে। এর ফলে স্থানীয় বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের সংকটে পড়ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশের পাশাপাশি কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকেও অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে বান্দরবানে চলে আসছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে চেহারা ও ভাষাগত মিল থাকায় তারা সহজেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে। কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি হওয়ায় অনেক মালিক ও ঠিকাদারও স্থানীয় শ্রমিকদের পরিবর্তে রোহিঙ্গাদের কাজে নিয়োগ দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু শ্রমবাজারেই নয়, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা বাগান ও বসতিতেও রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি বাড়ছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগও বাড়ছে।

জানা গেছে, নির্মাণকাজ, কৃষিখেত, ইটভাটা, পাথর উত্তোলন, মাটি কাটা, অটোরিকশা চালনা, আবাসিক ও খাবারের হোটেল, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, কাঠ কাটা ও বহন, রাবার বাগান, আমবাগান, তামাকখেত এবং মৎস্য খামারসহ বিভিন্ন শ্রমনির্ভর পেশায় বর্তমানে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয়দের তুলনায় কম পারিশ্রমিকে কাজ করায় নিয়োগদাতাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

বান্দরবানের সুয়ালক এলাকায় কর্মরত এক রোহিঙ্গা শ্রমিক হোসেন আলী বলেন, তারা ভারী ও কষ্টসাধ্য কাজ করতে অভ্যস্ত এবং স্থানীয়দের তুলনায় কম মজুরিতে কাজ করেন। ফলে বিভিন্ন জায়গায় সহজেই কাজ পেয়ে যান।

সম্প্রতি সদর উপজেলার রেইছা এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, রেইছা বাজার, ভান্ডারিপাড়া ও গোয়ালিয়াখোলা এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে রোহিঙ্গা শ্রমিকরা গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। সেখানে কাজ করা এক শ্রমিক দিল মোহাম্মদ জানান, বিভিন্ন ঠিকাদার বা মাঝির মাধ্যমে তারা কাজ পান। কাজ শেষে অনেকেই আবার অন্য এলাকায় চলে যান, তবে কিছু রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবেও পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছেন।

গোয়ালিয়াখোলা এলাকার স্থানীয় শ্রমিক মো. কামাল অভিযোগ করে বলেন, আগে সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত কাজ পাওয়া গেলেও এখন রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কারণে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিনের বেশি কাজ পাওয়া যায় না। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা রুপলা ধর বলেন, বর্তমানে অনেক এলাকায় স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া গেলেও মালিকরা কম খরচে কাজ করাতে রোহিঙ্গাদেরই বেশি নিয়োগ দেন। একই অভিযোগ করেন স্থানীয় শ্রমিক সাইদ হোসেন। তিনি বলেন, যেখানে স্থানীয় শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, সেখানে রোহিঙ্গারা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় একই কাজ করে দেয়। ফলে স্থানীয়দের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

সীমান্ত সূত্রে জানা যায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও আলীকদম সীমান্তের বেশ কয়েকটি দুর্গম এলাকা এখনো কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে পাহাড়ি ঝিরি, ছড়া ও দুর্গম পথ ব্যবহার করে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী ১১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় প্রায় ৭১ কিলোমিটার এবং সংশ্লিষ্ট জোনের আওতায় প্রায় ৯৪ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। তবে সীমান্তের কিছু দুর্গম এলাকায় পর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগ না থাকায় সেখানে অনুপ্রবেশ রোধে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে।

স্থানীয়দের দাবি, আগে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি মূলত নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও আলীকদমে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তারা বান্দরবান শহর হয়ে রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচির মতো দুর্গম এলাকাতেও প্রবেশ করছে।

এ বিষয়ে বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওয়াহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের আটক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোনো তথ্য থাকলে স্থানীয় জনগণ ও গণমাধ্যমকর্মীরা প্রশাসনকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিশেষ প্রতিনিধি নীলিমা আক্তার নীলা বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ এমনিতেই সীমিত। এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের শ্রমবাজারে প্রবেশ স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। তিনি এ বিষয়ে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার, অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *