সেনা নিয়োগ, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তায় দেশ ছাড়ছে মিয়ানমারের মানুষ; ৪ মাসে থাইল্যান্ডে প্রবেশ প্রায় ৭ লাখ

সেনা নিয়োগ, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তায় দেশ ছাড়ছে মিয়ানমারের মানুষ; ৪ মাসে থাইল্যান্ডে প্রবেশ প্রায় ৭ লাখ

সেনা নিয়োগ, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তায় দেশ ছাড়ছে মিয়ানমারের মানুষ; ৪ মাসে থাইল্যান্ডে প্রবেশ প্রায় ৭ লাখ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী গৃহযুদ্ধ, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ, অর্থনৈতিক সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে মিয়ানমার থেকে ব্যাপক হারে মানুষ প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিচ্ছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই প্রায় ৬ লাখ ৮৭ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক থাইল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত আইওএমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তাক, রানং, কানচানাবুরি এবং চিয়াং রাই প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে মোট ৬ লাখ ৮৭ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক থাইল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ আইন কার্যকর করার পর দেশ ছাড়ার প্রবণতা আরও বেড়েছে। পাশাপাশি গত বছর মধ্য মিয়ানমারে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করছে। অনেকেই জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এড়াতে এবং উন্নত জীবিকার সন্ধানে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন।

আইওএম জানায়, থাইল্যান্ডে প্রবেশকারীদের মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেন। তবে তারা কতদিন থাইল্যান্ডে থাকবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। এছাড়া অনেক অভিবাসী থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত ব্যবহার করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এই রুটে অভিবাসনের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ কঠিন হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণও জটিল হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইওএম মোট ৩ হাজার ৫০৪ জন মিয়ানমারের নাগরিকের সাক্ষাৎকার নেয়। তাদের মধ্যে ৪১ শতাংশের কাছেই কোনো বৈধ সরকারি ভ্রমণ বা পরিচয়পত্র ছিল না।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ডে এসেছেন। ২৮ শতাংশ পরিবার বা স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ৯ শতাংশ কর্মসংস্থানের জন্য দেশ ছেড়েছেন এবং ৬ শতাংশ সরাসরি সংঘাতের কারণে মিয়ানমার ত্যাগ করেছেন।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সংঘাত, দমন-পীড়ন এবং নিরাপত্তাহীনতা থেকে বাঁচতে বিপুল সংখ্যক মিয়ানমারের নাগরিক দেশত্যাগ করছেন। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে থাইল্যান্ড শুধু শ্রমিকদের নয়, শরণার্থী ও নিরাপত্তা প্রত্যাশীদেরও প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ আইন। এ আইনের আওতায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী নারীদের সর্বোচ্চ দুই বছর সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে দায়িত্ব পালনের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

থাইল্যান্ডে পালিয়ে যাওয়া এক তরুণী বলেন, “আপনারা জানেন, আমাদের দেশে এখন আর নিরাপদে থাকা যায় না। তরুণদের জন্য কোনো সুযোগও নেই। তাই আমরা থাইল্যান্ডে চলে এসেছি। এখানকার সংস্কৃতি আমাদের দেশের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে।”

আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে আনুমানিক ৪৬ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ দেশটির শ্রম অধিদপ্তরে নিবন্ধিত। এছাড়া শুধু গত বছরই সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলো দিয়ে প্রায় ২০ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক থাইল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন।

জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ এড়াতে দেশ ছেড়ে যাওয়া এক তরুণ বলেন, “সামরিক বাহিনীতে নাম নিবন্ধনের জন্য সরকার আমাকে চিঠি পাঠিয়েছিল। এরপরই আমরা থাইল্যান্ডে চলে আসি।”

এদিকে, জার্মানির Hanns-Seidel-Stiftung এবং Chulalongkorn University-এর Nelson Mandela Centre-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সামরিক অভ্যুত্থানের পর থাইল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছয় গুণ বেড়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট (CDM)-এর বিরুদ্ধে সামরিক দমন-পীড়ন এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার কারণে ২০২১ সালের আগে যেখানে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ জন মিয়ানমারের শিক্ষার্থী থাইল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেন, সেখানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

অন্যদিকে, গত ২৩ মে থাইল্যান্ডভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান Happio প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডে বসবাসরত ৪০ লাখের বেশি মিয়ানমারের নাগরিক এখন দেশটির অর্থনীতিতে একটি বড় ভোক্তা গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন। তাদের সম্মিলিত বার্ষিক ক্রয়ক্ষমতার পরিমাণ প্রায় ২২১ বিলিয়ন থাই বাত (প্রায় ৬ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

গবেষণায় আরও বলা হয়, থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের নাগরিকদের সবচেয়ে বড় আবাসস্থল বর্তমানে রাজধানী ব্যাংকক, যেখানে ৫ লাখ ২০ হাজারের বেশি মিয়ানমারের নাগরিক বসবাস করছেন। এছাড়া সামুত সাখন, চিয়াং মাই, তাক এবং রানং প্রদেশেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মিয়ানমারের অভিবাসী বসবাস করছেন।

প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশত্যাগী মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, এই অভিবাসন প্রবণতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানবিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed