মিয়ানমারের নিয়ে সমালোচনার জেরে জাতিসংঘ দূত জুলি বিশপের বিরুদ্ধে জান্তা প্রচারণা
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করার পর জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছে দেশটির সামরিক সরকার ও তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে ‘অপ্রীতিকর কূটনীতিক’ আখ্যা দিয়ে তার সততা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘে দেওয়া তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েই জান্তা সরকার এই প্রচারণা শুরু করেছে।
গত ১৯ জুন জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশ্যে এক ব্রিফিংয়ে জুলি বিশপ মিয়ানমারে সামরিক সরকারের আয়োজিত বহুল সমালোচিত নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশটির পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তার এই বক্তব্যের পরপরই সামরিক সরকার ও সেনাবাহিনী-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো সমন্বিতভাবে তার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে।
জুলি বিশপ এ পর্যন্ত চারবার মিয়ানমার সফর করেছেন এবং তিনবার সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সর্বশেষ গত ২১ মে তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া তিনি মিয়ানমারের ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি), ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি), বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সম্প্রতি গঠিত স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য এমার্জেন্স অব অ্যা ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (SCEF)-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
গত ২৪ জুন সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্রগুলোতে জাতিসংঘ ও জুলি বিশপের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ‘UN Interference and Failures’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ এবং একটি সম্পাদকীয়তে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও তথ্য বিকৃতির অভিযোগ আনা হয়।
পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার এই প্রচারণা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। সেনাপ্রধানের দপ্তরের ওয়েবসাইট, সেনাবাহিনীর মুখপত্র মিয়াওয়াদি (Myawaddy) ও ইয়াদানারবোন (Yadanarbon) পত্রিকা এবং সামরিক নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য প্রকাশনায় ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষায় জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্দেশে একটি তথাকথিত ‘খোলা চিঠি’ প্রকাশ করা হয়।
জুলি বিশপের ছবি সংযুক্ত ওই লেখায় তাকে এমন একজন কূটনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যিনি মিয়ানমারের কোনো উপকার করেননি। সেখানে তাকে অযোগ্য, অপেশাদার এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা হয়, এমন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
খোলা চিঠিতে বলা হয়, “জাতিসংঘের মতো একটি বড় আন্তর্জাতিক সংস্থা কীভাবে এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিল, যার বিরুদ্ধে নৈতিক অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে? এটি কি জাতিসংঘের যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ে ব্যর্থতা, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে—সে প্রশ্ন ওঠে।”
তবে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও এ বিষয়ে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। বরং সরকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেখক এবং সম্পাদকীয়র মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছে।
প্রকাশিত নিবন্ধগুলোতে জুলি বিশপের সাইবার অপরাধ, খাদ্যসংকট, বিমান হামলা, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং যৌন সহিংসতা সংক্রান্ত বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত কিংবা মনগড়া বলে দাবি করা হয়। পাশাপাশি জাতিসংঘের বিরুদ্ধে বিরোধী গোষ্ঠী এবং পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
রাষ্ট্রীয় বার্মিজ দৈনিক কিয়েমন (Kyemon Daily)-এর বৃহস্পতিবারের সম্পাদকীয়তেও একই ধরনের সমালোচনা করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, জাতিসংঘ নিয়মিতভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে এবং সংস্থাটির নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মিয়ানমারের পুনর্গঠিত সামরিক সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশটির আসিয়ান (ASEAN) এবং জাতিসংঘে ‘পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণের’ পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর জান্তা সরকার কিছুটা কূটনৈতিক উৎসাহ পেয়েছে। তবে পুনর্গঠিত প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনেরও বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত আসিয়ান কিংবা জাতিসংঘ—কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের জন্য মরিয়া সামরিক সরকারের জন্য বিষয়টি এখনও বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।