মিতালি চাকমা থেকে স্বপ্না চাকমা, আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়না নিজ জাতির মেয়েরাও - Southeast Asia Journal

মিতালি চাকমা থেকে স্বপ্না চাকমা, আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়না নিজ জাতির মেয়েরাও

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস ও প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে পাহাড়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে পাহাড়ে খুন, অপহরণসহ ধর্ষন ও নিরপরাধ পাহাড়বাসীকে নির্যাতনের ঘটনা নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব সন্ত্রাসী সংগঠনের অপহরণ, ধর্ষন ও নির্যাতন থেকে রেহাই পাচ্ছেনা খোদ নিজ জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরাও। পাহাড়ে মিতালী চাকমা, নওমুসলিম ফাতেমা, আয়না চাকমারা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে এসব অাঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের কর্মীদের হাতে।

সূত্র মতে, গত ৭জুন রবিবার গভীর রাতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের লম্বাছড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে প্রসীত পন্থি ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কর্তৃক অপহৃত হন মেয়ে স্বপ্না চাকমা (২৬)। অপহৃত স্বপ্না চাকমা একই এলাকার তরু চাকমার মেয়ে। অপহরণের পর তার উপর চলে ইউপিডিএফের পাশবিক নির্যাতন।

জানা যায়, রাতে চোখ-মুখ বেঁধে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের সোনামিয়া টিলার একটি বাড়িতে আটকে রেখে সন্ত্রাসীরা রাতভর তার উপর পাশবিক ও পৈশাচিক নির্যাতন চালায় স্বপ্না চাকমার উপর। স্বপ্না চাকমা জেএসএস (সংস্কার) দল করে এই সন্দেহের উপর ভিত্তি করেই তাঁর উপর এই বর্বর নির্যাতন চালায় সন্ত্রাসীরা। পরবর্তীতে রাতভর অত্যাচার ও পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে সকালে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

ছবি-১: নির্যাতিতা স্বপ্না চাকমা

নির্যাতিতার পিতা তরু চাকমা জানান, তার অবিবাহিতা মেয়েকে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা রাতভর পাশবিক অত্যাচার করলেও অস্ত্রের ভয়ে তারা প্রশাসনের কাছে যেতেও ভয় পাচ্ছেন।

এদিকে এঘটনার তীব্র নিন্দা ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’র নেতা জনপ্রিয় চাকমা বলেন, প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস নিজেদের অাদর্শ থেকে সরে এসে শুধুমাত্র স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজ জাতির মা-বোনদের উপর নির্যাতন চালাতেও দ্বিধাবোধ করছে না। তিনি অবিলম্বে এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান।

উল্লেখ্য, এর আগেও ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সাথে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় অস্বীকৃতি জানানোর কারণে সন্ত্রাসীরা গত ৪ জুলাই ২০১৭ তারিখে রাঙামাটির নানিয়ারচরের লম্বাছড়ি থেকে মদন চাকমা নামে একজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের আস্তানা থেকে কৌশলে মদন চাকমা পালিয়ে যেতে গেলে সন্ত্রাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে মদন চাকমার নিজ বাড়ি থেকে তার স্ত্রী শুবলপুরি চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপ শুবলপুরি চাকমাকে অপহরণ করে যৌন কাজে ব্যবহারের জন্য আটকে রাখে। পরে মদন চাকমার অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তার স্ত্রীকে উদ্ধার করে নিরাপত্তাবাহিনী। এই ঘটনায় জড়িত থাকায় অমরেশ চাকমা নামে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের একজন গ্রেফতার হয়। ২০১৬ সালের ১৮ নভেম্বর রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার নানাপুরণ গ্রামে নিজ বাড়ী থেকে অস্ত্রের মুখে জোসনা চাকমাকে তুলে নিয়ে যায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপ সমর্থিত সংগঠন যুব পরিষদ কর্মীরা। গলায় ও পায়ে শিকল পরিয়ে দীর্ঘ ২ মাস নির্যাতন করা হয় তাকে। পরে নিরাপত্তাবাহিনী তাকে উদ্ধার করে।

ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের পক্ষে কাজ করতে রাজি না হওয়ায় মিতালী চাকমা নামে রাঙামাটি সরকারি কলেজের ডিগ্রী ৩য় বর্ষের এক কলেজ ছাত্রীকে টানা তিন মাস তাদের আস্তানায় আটকে রেখে শারীরিক অত্যাচার ও ধর্ষণ করে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সদস্যরা। গত ১৭ আগস্ট ২০১৮ তারিখে মিতালী চাকমাকে রাঙামাটি সদরের সাপছড়ি ইউনিয়নের বোধিপুর নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সদস্যরা। মিতালী চাকমাকে দলে যোগ দেয়ার জন্য চাপ দিলে তিনি রাজী না হওয়ায় তাকে ধর্ষণ করে গর্ভবতী করে মানসিক দৃঢ়তা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় গ্রুপটি। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিন মাস ধরে মেয়েটির উপর নির্যাতন চালায় তারা। অপহৃত মিতালী চাকমাকে প্রায় ২ মাস পরে (১৯ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে) উদ্ধার করে যৌথবাহিনী। গত ১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা-বাঘাইহাট সড়কের শুকনাছড়ি এলাকা থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী রিমি চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা। অপহরণের পর এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক অভিযানে নামে বাঘাইহাট ও দীঘিনালার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনীর সদস্যরা। এসময় সেনাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির কারণে সন্ত্রাসীরা কোণঠাসা হয়ে পড়লে এক পর্যায়ে রাত দশটার দিকে শুকনাছড়িতে স্নেহ কুমার চাকমার বাড়ির কাছে উক্ত শিক্ষার্থী রিমি চাকমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা।

খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার ক্ষেত্রলাল ত্রিপুরার মেয়ে দীপা ত্রিপুরাকে গত ১২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে অপহরণ করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) কর্মীরা। অপহরণের পর একটি জুম ঘরে আটক করে দীপা ত্রিপুরাকে পালাক্রমে গণধর্ষণ করে পিসিপি’র এসব সন্ত্রাসীরা। এসময় পুরো গণ-ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে তারা। গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে মাটিরাংগার বাইল্যাছড়ি এলাকা হতে চলন্ত বাস থেকে স্বামীর সামনে থেকে নয়ন ত্রিপুরা ওরফে ফাতেমা বেগমকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা। নয়ন ত্রিপুরার অপরাধ ছিলো সে ভালবেসে বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করেছিলো।

গত ৩০ মে ২০১৬ তারিখে, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি থেকে আঞ্চলিক সংগঠণ জেএসএস (সন্তু) গ্রুপ এর হাতে অপহৃত হন অবসর প্রাপ্ত সার্জেন্ট মুকুল চাকমা। যিনি এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ। ঘটনার পর বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে থানায় মামলা দায়ের করার পর থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী কর্তৃক নানান রকম হুমকির সম্মুখীন হয়েছে মুকুল চাকমার স্ত্রী এবং কন্যা নমিসা চাকমা। চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ মহিলা কলেজের অনার্সের ছাত্রী নমিসা চাকমা নিরাপত্তাহীনতার কারণে পড়ালেখা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে এখন তারা সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে আত্নগোপনে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তার মা এবং তারা দুই বোন এখন আর পৈতৃক ভিটায় যেতে পারছেন না। গত ২৯ মে ২০১৬ তারিখে, রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলাতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জেএসএস (সন্তু) গ্রুপ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) অর্থ সম্পাদক সুনীতিময় চাকমা এর নেতৃত্বে প্রায় ২০ জনের একটি দল আয়না চাকমা নামক এক কিশোরীকে অপহরণ করে। এরপর গহীন জঙ্গলে নিয়ে আয়না চাকমাকে যৌন নির্যাতন করে তারা।

গত জুন ২০১৩ তারিখে, বাঙালী মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করার অপরাধে রাঙামাটির কুতুকছড়িতে চলন্ত অটোরিক্সা থেকে নামিয়ে রিনা ত্রিপুরা নামে এক পাহাড়ি যুবতিকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা। যার সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।  অপহৃত রীনা ত্রিপুরার বাড়ি বান্দরবানের লামা উপজেলার কুমারী পাড়ার ইয়াং ছড়া গ্রামে। একই ভাবে ২০১৫ সালের মার্চ মাসের দিকে ভালোবেসে এক বাঙ্গালী ছেলেকে বিয়ে করার অপরাধে খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা থানাধীন হাফছড়ির থোয়াই অং মারমা‘র মেয়ে উমাচিং মারমা ও তার পরিবারকে নির্যাতনসহ সে পরিবার থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা ও স্থানীয় পাহাড়ী জনপ্রতিনিধিবৃন্দ। তারা বাঙালী স্বামীকে ত্যাগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে মেয়েটির প্রতি। কিন্তু মেয়েটি তা অস্বীকার করায় ঐ সন্ত্রাসীরা উমাচিং মারমাকে বেঁধে একটি কক্ষে আটকে রাখে এবং অমানুষিক নির্যাতন করে বাঙালী স্বামীকে ত্যাগ করতে বলে। কিন্তু মেয়েটি তাতে রাজি না হয়ে সকল অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে থাকে। এক পর্যায়ে সুযোগ বুঝে মেয়েটি পালিয়ে ঢাকায় তার স্বামীর কাছে চলে যায়।

এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে। তবে যে সমস্ত নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রকাশ পায় শুধু সেগুলোই জানতে পারছে মানুষ। নিরাপত্তার অভাবে পাহাড়ী নারীরা বা তার পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে মুখ খুলতেও সাহস করে না। সামপ্রতিক সময়ে পাহাড়ী তরুণীদের নিজ জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের হাতে এরূপ নির্বিচারে গণধর্ষণের শিকার হওয়া নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী উপন্যাস বের করেন লেখিকা রোকেয়া লিটা। ‘ডুমুরের ফুল’ নামে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ বইটি বের করলে উপজাতি সংগঠন কর্তৃক তাকে গণধর্ষণ করে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়া হয়।