জোয়ার-ঝড়ের আতঙ্ক পেরিয়ে নুর বেগমের স্থায়ী ঠিকানা খুরুশকুল , ৭৪৪ পরিবারের স্বপ্ন পূরণ
![]()
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার
৩৫ বছর ধরে জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন নুর বেগম (৬০)। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার পূর্ব আলী আকবর ডেইলের ডাক্তারপাড়া থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দরপাড়ার সরকারি খাসজমিতে। স্বামী হারানোর পর ছেলে-মেয়েসহ পাঁচ সদস্যের সংসার টেনে নিয়েছেন চরম কষ্টে। টিন ও পলিথিনের ছোট্ট ঝুপড়িই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। জোয়ারের পানি উঠলেই ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে ছুটতে হতো, আর পানি নেমে গেলে আবার ফিরে আসতেন সেই ভাঙাচোরা ঘরে।
বছরের পর বছর এমন অনিশ্চিত জীবন কাটানোর পর অবশেষে ভাগ্য বদলের দিন এলো। খুরুশকুল জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পের লটারিতে নাম ওঠার পর আনন্দে চোখ ভিজে যায় নুর বেগমের। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি পেলেন একটি নিরাপদ ফ্ল্যাট যে স্বপ্ন তিনি কখনো পূরণ হবে বলে ভাবেননি।
গত রোববার (৩ আগস্ট) কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য নির্মিত বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে দ্বিতীয় ধাপে ৭৪৪টি পরিবারের মধ্যে ভবন ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ২০২০ সালে প্রথম ধাপে ৬০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এই প্রথম ধাপে ২০টি পাঁচতলা ভবনে এই পরিবারগুলোকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অশ্রুসজল চোখে নুর বেগম বলেন, “অনেক কষ্ট করেছি বাবা। জোয়ার এলেই ঘর ছেড়ে অন্যের বারান্দায় গিয়ে বসে থাকতে হতো। আবার পানি নামলে ফিরে আসতাম। কখনো ভাবিনি জীবনের শেষ বয়সে নিজের নামে একটি নিরাপদ ফ্ল্যাট হবে। আজ মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের দিকে তাকিয়েছেন।”

একই এলাকার আরেক স্বামীহারা নারী মনোয়ারা বেগমও দীর্ঘদিন ধরে বন্দরপাড়ার ঝুপড়িঘরে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের। বর্ষা এলেই ঘরে পানি, ঝড় এলেই আতঙ্ক এভাবেই কেটেছে বছরের পর বছর। লটারিতে ফ্ল্যাট পাওয়ার খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
মনোয়ারা বেগম বলেন, “স্বামী চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল মাথার ওপর একটা নিরাপদ ছাদ কোনোদিন হবে না। সন্তানদের নিয়ে কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছি। এখন অন্তত ওদের নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারব। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
উপকারভোগী সেলিনা আক্তার বলেন, “বছরের পর বছর টিন আর পলিথিনের ঘরে থেকেছি। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ত, ঝড় এলেই আতঙ্কে রাত কাটাতে হতো। এখন একটি নিরাপদ ফ্ল্যাট পেয়েছি। মনে হচ্ছে নতুন করে বাঁচার সুযোগ পেলাম।”
১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার উত্তর মুরালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া রাশেদুল আরমান বলেন, “৩৫ বছর ধরে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের সাগরপাড়ে সরকারি খাসজমির ঝুপড়িতে থেকেছি। জীবনের শেষ বয়সে এসে লটারিতে নাম ওঠার পর খুশিতে চোখে পানি এসে গেছে। ঝুপড়ি থেকে একটি ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পেয়েছি।”
জেলে আবদুল মুজিব বলেন, “সমুদ্রভাঙনে সব হারিয়ে পরিবার নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। নিজের নামে একটি ফ্ল্যাট হবে এমন স্বপ্নও দেখিনি। সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দেবে।”
গৃহিণী ছেনুয়ারা বেগম বলেন, “ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে ঝুপড়িতে নিরাপদে থাকা যেত না। এখন অন্তত সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ পেলাম। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।”
স্থানীয় সমাজ নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, “এলাকার জলবায়ু উদ্বাস্তু ও অসহায় মানুষগুলোর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি টেকসই ও নিরাপদ আবাসন। সরকারের আন্তরিক উদ্যোগে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা পেয়ে উপকারভোগীদের মুখে এখন হাসি ফুটেছে। যাদের নাম এবার লটারিতে আসেনি, তারাও পরবর্তী ধাপে পুনর্বাসনের সুযোগ পাবেন এমন প্রত্যাশা আমাদের রয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আইয়ুবল ইসলাম বলেন, “থাকার জন্য ঘর ছাড়াও এখানে রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।”
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দিপু বলেন, “বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। খুরুশকুলের মতো পরিকল্পিত পুনর্বাসন প্রকল্প জলবায়ু অভিযোজনের একটি কার্যকর উদাহরণ। তবে আবাসনের পাশাপাশি জীবিকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করতে হবে।”

জানা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের কারণে বাস্তুচ্যুত চার হাজারের বেশি পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড (ইসিবি) প্রায় এক হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের আওতায় ১২৮টি পাঁচতলা ভবনে মোট ৪ হাজার ১২৮টি পরিবারের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক, সেতু, জেটি, সড়কবাতি, মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার, সাইক্লোন শেল্টার, মার্কেট কমপ্লেক্স, শুঁটকিমহাল, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা।
প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিরাজুল ইসলাম বলেন, “এই প্রকল্পের কাজ গুণগত ও মানসম্মতভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। ভবনের পাশাপাশি এখানে পানি শোধনাগার, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ড্রেনেজ ও জেটিসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে। এ আবাসন প্রকল্প জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জন্য টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার উদ্যোগ।”
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “যাচাই-বাছাই শেষে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় লটারির মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৭৩০টি পরিবারকে আবাসনের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি পরিবারগুলোকেও পুনর্বাসন করা হবে।”
পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, “পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।”
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এর আগে ২০টি ভবনে ৬০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। বর্তমানে ১২২টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ভবনগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।