রাজস্থলীতে এসএসসির ফল বিপর্যয়: পাসের হার ৩০.৩৯%, জিপিএ-৫ শূন্য
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলায় বড় ধরনের ফল বিপর্যয় ঘটেছে। উপজেলার চারটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৪১ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৩৪ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ৩০৭ জন। ফলে উপজেলায় গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ দশমিক ৩৯ শতাংশে। এবার কোনো শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পায়নি।
ফল প্রকাশের পর এমন ফলাফলে স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রত্যন্ত এই উপজেলার শিক্ষার মান ও বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজস্থলীর চারটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ বছর মোট ৪৪১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১৩৪ জন উত্তীর্ণ হলেও ৩০৭ জনই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলেও বড় ধরনের তারতম্য দেখা গেছে। তুলনামূলক ভালো ফল করেছে কারিগরি শাখার বাঙালহালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়। বিপরীতে সবচেয়ে হতাশাজনক ফল করেছে গাইন্দ্যা উচ্চ বিদ্যালয়।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের ঘাটতি, শিক্ষকদের একটি অংশের প্রাইভেট পড়ানো ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের কারণে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, “শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ না দিয়ে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতেই বেশি আগ্রহী। পাশাপাশি ম্যানেজিং কমিটির কোনো তদারকি নেই। ফলাফল শুনে আমরা স্তম্ভিত।”
স্থানীয়দের কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের অবাধ স্মার্টফোন ব্যবহার এবং পড়াশোনার প্রতি অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবকেও ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন।
বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকার বিষয়টিও ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্থলী তাইতং পাড়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এমদাদউল্ল্যা বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের ১০৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩৩ জন পাস করেছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় আমরা অতিথি শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষার মান উন্নত করতে দ্রুত স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ জরুরি।”
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সহায়তা দেওয়া এবং পরীক্ষার আগে কার্যকর একাডেমিক তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্থলীর এবারের ফলাফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—চারটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি। একই সঙ্গে ৪৪১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩০৭ জন অকৃতকার্য হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এমন ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এর সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির মতো বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তাদের মত।
সামগ্রিক ফলাফলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজস্থলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইউছুপ হাসান।
তিনি জানান, ফল বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে করণীয় নির্ধারণে উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিয়ে মঙ্গলবার জরুরি মতবিনিময় সভা আহ্বান করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও স্থানীয়দের মতে, কেবল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আলোচনা করে থেমে না থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ, শিক্ষক সংকট নিরসন, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি বাড়ানো না গেলে আগামী বছরও একই ধরনের ফল বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যাবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।