মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও কিট বিতরণ করল সেনাবাহিনী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এখনও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। পাহাড়ি পথ, দীর্ঘ দূরত্ব এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে দুর্ঘটনা কিংবা আকস্মিক অসুস্থতার পর অনেক সময় দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রাথমিক চিকিৎসায় দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন।
এর অংশ হিসেবে বাবুছড়ামুখ উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে বিনামূল্যে ফার্স্ট এইড কিট বিতরণ এবং এলাকার দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়।
স্থানীয় জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সভাপতিত্ব করেন দীঘিনালা জোনের রেজিমেন্টাল মেডিকেল অফিসার (আরএমও)। বাবুছড়া ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ড থেকে তিনজন করে মোট ২৭ জন প্রশিক্ষণার্থী এতে অংশ নেন।
প্রশিক্ষণে দুর্ঘটনা ও আকস্মিক অসুস্থতার সময় কীভাবে দ্রুত ও নিরাপদে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ, আঘাতের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ব্যক্তির তাৎক্ষণিক পরিচর্যা এবং বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে প্রয়োজনীয় ফার্স্ট এইড কিট তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রশিক্ষণার্থীরা শুধু প্রশিক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না; বরং নিজেদের এলাকায় জরুরি মুহূর্তে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও পাচ্ছেন।
দুর্গম পাহাড়ে কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক চিকিৎসা
পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা সমতলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রত্যন্ত পাহাড়ি পাড়া থেকে উপজেলা সদর বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে অনেক সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বর্ষাকালে পাহাড়ি সড়কে কাদামাটি, পানি ও ভূমিধসের কারণে যোগাযোগ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনা, সাপের কামড়, কাটা-ছেঁড়া, অতিরিক্ত রক্তপাত কিংবা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগের সময়টুকুই অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় কয়েকজন মানুষ যদি সঠিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারেন, তাহলে রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তার অবস্থা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ করা, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদে স্থানান্তর করা কিংবা অচেতন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

দীঘিনালা জোনের এ উদ্যোগের অন্যতম তাৎপর্য এখানেই—শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই একটি প্রাথমিক সহায়তা সক্ষমতা তৈরি করা।
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি চিকিৎসা ও ওষুধ
প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মসূচিতে এলাকার দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধও বিতরণ করা হয়।
ফলে কর্মসূচিটি একই সঙ্গে দুটি প্রয়োজন পূরণ করেছে। একদিকে স্থানীয় মানুষ পেয়েছেন জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান ও দক্ষতা, অন্যদিকে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীরা পেয়েছেন চিকিৎসা ও ওষুধের সহায়তা।
স্থানীয় জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করায় স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

‘সহায়তা’ থেকে সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রত্যন্ত এলাকায় কেবল এককালীন চিকিৎসা বা ওষুধ বিতরণের চেয়ে স্থানীয় জনগণকে প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত করে তোলা দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও এলাকার অন্য মানুষের জরুরি মুহূর্তেও সহায়তা করতে পারবেন।
এভাবে একটি এলাকার কয়েকজন প্রশিক্ষিত মানুষ ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তার একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন, সেখানে এ ধরনের স্থানীয় সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোনের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কিংবা ফার্স্ট এইড কিট বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবেও এটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতেও এ ধরনের কার্যক্রম ইতিবাচক ভূমিকা রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার এ উদ্যোগ একটি সচেতন, সক্ষম ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।