হাতির খাবার যাচ্ছে বাজারে, বাড়ছে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব
![]()
আজ বিশ্ব হাতি দিবস: উখিয়ার বন থেকে বাঁশকোড়ল সংগ্রহ করে প্রকাশ্যে বিক্রি, সংকুচিত হচ্ছে খাদ্য ও চলাচলের পথ
জার্নাল প্রতিবেদক
বন্যহাতির খাবার যাচ্ছে মানুষের বাজারে। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং, থাইংখালী, বালুখালীসহ বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে হাতির অন্যতম পছন্দের খাদ্য বাঁশকোড়ল। সড়কের পাশে ও বাজারের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ দোকানে সাজিয়ে রাখা এসব বাঁশকোড়ল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা দরে।
বনাঞ্চল থেকে বাঁশকোড়ল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রির এই প্রবণতা একদিকে যেমন স্থানীয়দের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে হাতির প্রাকৃতিক খাদ্যভাণ্ডারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে উখিয়া-টেকনাফের বনাঞ্চলে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ চলাচলের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং বাড়ছে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব।
আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। বিশ্বজুড়ে এ দিনটি হাতি সংরক্ষণ ও তাদের আবাসস্থল রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির দিন হিসেবে পালিত হয়।
বাজারে হাতির খাবার
সরেজমিনে কুতুপালং, থাইংখালী ও বালুখালীসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে সারি সারি ভ্রাম্যমাণ দোকানে বাঁশকোড়ল বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাঁশকোড়ল সংগ্রহ করে বাজারে নিয়ে আসেন। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এসব পণ্য বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারে বাঁশকোড়লের চাহিদা ও দাম বাড়ায় বনাঞ্চল থেকে এর সংগ্রহও বেড়েছে। এতে বনের বাঁশঝাড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বন্যহাতির প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমাণও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির আবাসস্থলে খাদ্যপ্রাপ্যতা কমে গেলে হাতি বিকল্প খাদ্যের সন্ধানে মানুষের বসতি ও কৃষিজমিতে প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশের সরকারি বন-তথ্যেও হাতির আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়া এবং চলাচলের পথে বাধা তৈরি হলে মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
সংকুচিত হাতির চলাচলের পথ
উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলে হাতির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি করিডোর রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া-ঘুমধুম, পানেরছড়া-তুলাবাগান ও নাইক্ষ্যংছড়ি-রাজারকুলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাতির চলাচলের পথ রয়েছে।
২০২৫ সালের বন বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলে প্রায় ৬৭টি হাতি বিচরণ করছে—এর মধ্যে উখিয়ায় প্রায় ৩০টি এবং টেকনাফে প্রায় ৩৭টি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা বসতি সম্প্রসারণের কারণে উখিয়া-টেকনাফের কয়েকটি হাতি করিডোর দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত।

এ ছাড়া বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অবকাঠামো নির্মাণ, বসতি সম্প্রসারণসহ নানা কারণে হাতির স্বাভাবিক আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে একসময় যে পথ দিয়ে হাতির দল নির্বিঘ্নে এক বনাঞ্চল থেকে অন্য বনাঞ্চলে যাতায়াত করত, বর্তমানে সেই পথের অনেকাংশেই মানুষের বসতি ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে হাতির সামনে তৈরি হয়েছে দুই ধরনের সংকট—খাদ্যের সংকট ও চলাচলের সংকট।
‘খাদ্যের অভাবেই হাতি লোকালয়ে আসছে’
ইনানী রেঞ্জের ছোয়ানখালী বিটের শাহ আলম বলেন, “আমাদের এলাকায় হাতির আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। মূলত খাদ্যের অভাবেই হাতি লোকালয়ে হানা দিচ্ছে।”
হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সরকারি আর্থিক সহায়তা পাওয়া তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “১০ বছর আগেও এখানে হাতি আসত না। গত কয়েক বছর ধরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন সপ্তাহে পাঁচবারের বেশি হাতি আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
থাইংখালীর তেলখোলা চাকমাপাড়া এলাকার আইনুচিং তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “হাতির এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরির কারণে আমরাও আতঙ্কে থাকি। কখন কোথা থেকে হাতি চলে আসে, তা নিয়ে সবসময় ভয় কাজ করে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের এসব অভিজ্ঞতা বলছে, হাতির লোকালয়ে প্রবেশকে শুধু ‘হাতির উৎপাত’ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণটি আড়াল হয়ে যায়। কারণ হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যভাণ্ডার যত সংকুচিত হবে, তাদের মানুষের এলাকায় ঢোকার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
তিনটি করিডোর বন্ধ হওয়ার কথা জানাল বন বিভাগ
উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা (সহকারী বন সংরক্ষক) মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, হাতির আবাসস্থল নিরাপদ রাখতে বন বিভাগের মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, “উখিয়া রেঞ্জে তিনটি হাতি করিডোর ছিল, যা আর্মি ক্যাম্প ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।”
মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব কমাতে স্থানীয়দের নিয়ে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। হাতির আবাসস্থলে অবৈধ স্থাপনা ও অবৈধ চাষাবাদ বন্ধেরও চেষ্টা চলছে।
হাতির খাদ্য নিশ্চিত করতে বনাঞ্চলে ডুমুর, গাব, চালতা ও উড়ি আমসহ বিভিন্ন খাদ্য উপযোগী গাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
‘মানুষ, হাতি—সবকিছুই পরিবেশের অংশ’
সম্প্রতি উখিয়া রেঞ্জের বনায়ন কার্যক্রম পরিদর্শনে এসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, মানুষ, হাতি কিংবা অন্যান্য বন্যপ্রাণী—সবকিছুই পরিবেশের একটি অংশ।
তিনি বলেন, হাতি তার নিজস্ব পথ দিয়ে চলাচল করে। সেই পথে মানুষের বসতি গড়ে উঠলে সংঘাত সৃষ্টি হয়। এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের মাধ্যমে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনের কাজ চলছে এবং পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে সংঘাত কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শুধু হাতি তাড়ালেই সমাধান হবে না
বন্যহাতি লোকালয়ে ঢোকার পর তাড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—হাতি বারবার লোকালয়ে আসছে কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে হাতির খাদ্য, পানি, আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর—এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। উখিয়া-টেকনাফে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি নতুন নয়; বন বিভাগের পুরোনো ব্যবস্থাপনা নথিতেও আবাসস্থল ক্ষতি, খাদ্য সংকট এবং খণ্ডিত করিডোরকে হাতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উখিয়া-টেকনাফে হাতি মৃত্যুর ঘটনাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই অঞ্চলে এক বছরে সাতটি হাতির মৃত্যু হয়েছিল; এর মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, গুলিবিদ্ধ হওয়া, দুর্ঘটনা, রোগ ও অপুষ্টির মতো কারণের কথা উঠে আসে।
বাঁশকোড়ল বিক্রি নিয়ে নজরদারি কতটা?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হাতির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য বাঁশকোড়ল যদি বনাঞ্চল থেকে ব্যাপকভাবে সংগ্রহ করে উখিয়ার বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হয়, তাহলে এ বিষয়ে বন বিভাগের নজরদারি কতটা কার্যকর?
বাঁশকোড়ল সংগ্রহের সব ঘটনাকে অবৈধ বলা যায় না—কারণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বনজ সম্পদের ওপর জীবিকা নির্ভরতার বিষয়টিও রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে অতিরিক্ত সংগ্রহের ফলে যদি হাতির খাদ্যভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেখানে নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, হাতিকে রক্ষা করতে হলে শুধু হাতির লোকালয়ে প্রবেশের পর ব্যবস্থা নিলে হবে না; হাতির খাবার ও আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে উৎসস্থলেই।
বিশেষ করে বাঁশকোড়লসহ বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনা, হাতির করিডোর পুনরুদ্ধার, অবৈধ স্থাপনা ও বন দখল বন্ধ, নিরাপদ পানি ও খাদ্যের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
কারণ বাজারে হাতির খাবার বিক্রি হওয়া হয়তো চোখে পড়া একটি ছোট দৃশ্য; কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি বড় পরিবেশগত সংকট।
বিশ্ব হাতি দিবসে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘হাতি কেন লোকালয়ে আসে?’—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, হাতির নিজের বন, খাবার ও চলাচলের পথ আমরা কতটা নিরাপদ রাখতে পারছি?
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।