‘কে আগে এসেছে’ নয়, আগামী পঞ্চাশ বছর আমরা কীভাবে একসঙ্গে থাকব?
![]()
ড. সরদার এ. হায়দার
পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার চাকরিজীবনের একটা বড় সময় কেটেছে। হিসাব করলে সাড়ে দশ বছরেরও বেশি। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান-পাহাড়ের মানুষ, রাস্তা, বাজার, পাড়া, হেডম্যান-কারবারি, স্থানীয় রাজনীতি, পাহাড়ি-বাঙালির পারস্পরিক সম্পর্ক- এসব খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। অনেক সুখের স্মৃতি আছে। আবার এমন অনেক ঘটনাও দেখেছি, যেগুলো মনে পড়লে এখনো খারাপ লাগে।
সবচেয়ে বেশি যেটা মনে হয়েছে, পাহাড়ে মানুষে মানুষে সম্পর্ক বাস্তবে যতটা জটিল, ঢাকা থেকে বসে আমরা সেটাকে তার চেয়েও বেশি সরল করে ফেলি। আমরা খুব দ্রুত দুইটা পক্ষ বানিয়ে ফেলি; পাহাড়ি আর বাঙালি। তারপর ধরে নিই, এক পক্ষের সবাই একইভাবে চিন্তা করে, আর অন্য পক্ষের সবাই তাদের বিরোধী।
বাস্তবে বিষয়টা মোটেও এমন না।
আমার পরিচিত অনেক পাহাড়ি আছেন, যারা নিজেদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে খুবই সচেতন, নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকারের ব্যাপারে দৃঢ়; আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতি তাঁদের কোনো বিরূপতা নেই। আবার অনেক বাঙালিকেও দেখেছি, যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকারের প্রতি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই অন্য একটা ছবি দেখা যায়।
‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে কিছুদিন পরপর এমন যুদ্ধ শুরু হয়, মনে হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় সংকট বুঝি এটাই।
এক পক্ষ বলছে-“আদিবাসী বলতেই হবে।”
অন্য পক্ষ বলছে-“বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই।”
এরপর যুক্তি খুব বেশিক্ষণ থাকে না। শুরু হয় গালাগালি। ‘সেটেলার’, ‘দখলদার’, ‘উপজাতি’, ‘বাঙ্গু’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’-যার হাতে যে শব্দ আছে, ছুড়ে দিতে থাকে।
তখন আমার প্রায়ই মনে হয়, আমরা আসলে সমস্যার সমাধান করছি, নাকি আরেকটা নতুন সমস্যা তৈরি করছি?
‘আদিবাসী’ শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ-আমি সেটা অস্বীকার করছি না। কোনো জনগোষ্ঠী নিজেকে কীভাবে দেখে, নিজেদের ইতিহাস কীভাবে ব্যাখ্যা করে, কোন নামে পরিচিত হতে চায়, এগুলো মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। কাজেই চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ যদি নিজেদের পরিচয় নিয়ে একটি অবস্থান নেন, সেটা শুনতেই হবে।
আবার রাষ্ট্রেরও একটা অবস্থান আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের” সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ‘Indigenous’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিষয়টা এত সরল নয়। ২০০৭ সালের United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples বা UNDRIP-এ Indigenous peoples-এর কোনো একটি সর্বজনস্বীকৃত কঠোর সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। Self-identification-কে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ UNDRIP গ্রহণের ভোটে বিরত ছিল।
আবার বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে ILO Convention No. 107-Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957-অনুসমর্থন করেছে। অর্থাৎ বিষয়টির আইনগত, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক কয়েকটি স্তর আছে। এগুলো নিয়ে গবেষণা হোক। বিতর্ক হোক। ইতিহাসবিদ, আইনবিদ, নৃবিজ্ঞানী আলোচনা করুন।
কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়।
এই শব্দটির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কি আমরা একে অন্যকে সম্মান করব না?
একজন চাকমার ভাষা, একজন মারমার সংস্কৃতি, একজন ম্রোর জীবনধারা কিংবা একজন ত্রিপুরার ঐতিহ্যকে সম্মান করতে আমার ‘আদিবাসী’ বিতর্কে তাঁর সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি কেন?
আবার একজন বাঙালি শুধু বাঙালি বলেই কেন তাকে চিরস্থায়ীভাবে ‘দখলদার’ হিসেবে দেখতে হবে?
এই জায়গাটাতেই আমার আপত্তি।
পাহাড়ে থাকতে গিয়ে দেখেছি, একই বাজারে পাহাড়ি-বাঙালি ব্যবসা করছে। একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। একই গাড়িতে যাচ্ছে। কারও বাড়িতে সমস্যা হলে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ সাহায্য করতে এসেছে-এমন ঘটনাও কম দেখিনি। আবার উত্তেজনা তৈরি হলে সেই একই মানুষ খুব দ্রুত দুই ভাগ হয়ে যায়।
তখন মনে হয়, সম্পর্কটা যেন শুকনো পাতার ওপর আগুন। বাইরে থেকে সব ঠিক, কিন্তু একটা ঘটনা হলেই পুরোনো সব অভিযোগ বের হয়ে আসে। কার জমি কে নিয়েছে, কে কাকে মেরেছে, কোন সময় কী হয়েছিল, কে আগে এসেছে, একসঙ্গে সব শুরু।
ইতিহাস অবশ্যই ভুলে যাওয়া যাবে না। কাপ্তাই বাঁধের কারণে যে মানুষগুলো বাস্তুচ্যুত হয়েছিল, তাদের কষ্ট ইতিহাসের অংশ। দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাত, শরণার্থী জীবন, ভূমি বিরোধ, সামরিকীকরণ নিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর যে স্মৃতি আছে, সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। একইভাবে বর্তমান সময়ে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি কিংবা পাহাড়ি পরিবারগুলোর কষ্টকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সমস্যা হয় যখন নিজের কষ্ট মনে রাখি, অন্যের কষ্টটা দেখি না।
কিছুদিন আগে ‘আদিবাসী’ প্রসঙ্গ নিয়ে একটা লেখা পড়ছিলাম। লেখাটায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল। যেমন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে কোনো আলোচনা হলে সেখানে তাঁদের প্রতিনিধি কোথায়? যাদের নিয়ে কথা হচ্ছে, তাঁদের না রেখে অন্যরা তাঁদের পরিচয়ের সিদ্ধান্ত নেবেন কেন?
আমি মনে করি, প্রশ্নটা যৌক্তিক। কিন্তু এরপর যখন পুরো বাঙালি বা মুসলমান জনগোষ্ঠীকে অপমান করে ভাষা ব্যবহার করা হয়, তখন আমার কাছে মূল প্রশ্নটাই দুর্বল হয়ে যায়। কারণ, আপনি বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আরেকটা জনগোষ্ঠীকে অপমান করতে পারেন না।
আবার উল্টো দিকেও একই কথা।
কোনো পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন অপরাধ করলে তার দায় সব চাকমা, মারমা বা অন্য পাহাড়ি মানুষের ওপর দেওয়া যায় না। কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের জন্য গোটা জাতিগোষ্ঠী দায়ী হতে পারে না। এই collective blame-টাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে।
একজন মানুষের অপরাধের দায় মানুষের। একটি সংগঠনের দায় সংগঠনের। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুল হলে সেই প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি হতে হবে। জাতিগত পরিচয়কে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করালে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং নতুন ক্ষোভ তৈরি হয়।
২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়েছিল। চুক্তির কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, কতটা হয়নি, এই প্রশ্নে প্রচুর মতভেদ আছে। গবেষকরা এসব নিয়ে লিখেছেন। Shaila Bala তাঁর Politics of Peace Agreement Implementation বইতেও দেখিয়েছেন, চুক্তি বাস্তবায়নের রাজনীতি কতটা জটিল।
আমি সেই বিতর্কে এখানে যাচ্ছি না। আমার কাছে চুক্তিটির একটা বড় তাৎপর্য আছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর রাষ্ট্র এবং সশস্ত্র রাজনৈতিক পক্ষ শেষ পর্যন্ত টেবিলে বসেছিল। অর্থাৎ দুই পক্ষই একসময় বুঝেছিল, অস্ত্র দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।
একসময় কথা বলতে হয়। এই শিক্ষাটা আমাদের ধরে রাখা দরকার। কিন্তু একটা peace accord আর মানুষের মনের peace এক কথা না। চুক্তি কাগজে হয়। সম্পর্ক তৈরি হয় মানুষের মধ্যে।
চুক্তি সরকার সই করে। কিন্তু পাশের বাড়ির মানুষটাকে বিশ্বাস করবে কি না, বাজারে একসঙ্গে বসবে কি না, স্কুলে ছেলেমেয়েরা একে অন্যকে কী চোখে দেখবে, এগুলো কোনো চুক্তিপত্র দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। এখানেই আমাদের বড় কাজ বাকি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে আমার পাশের মিজোরামের কথা মনে হয়। মিজোরামেও ভয়াবহ সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে। ১৯৬৬ সালে Mizo National Front-এর বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রায় দুই দশক সংঘাত চলেছে। তারপর ১৯৮৬ সালের ৩০ জুন ভারত সরকার, মিজোরাম সরকার ও MNF-এর মধ্যে Mizoram Peace Accord হয়।
পরের ঘটনাটা গুরুত্বপূর্ণ।
যে MNF একসময় অস্ত্র নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছে, সেই সংগঠন পরে সাংবিধানিক রাজনীতিতে এসেছে। তাদের নেতা লালডেঙ্গা মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছেন। ১৯৮৭ সালে মিজোরাম ভারতের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যে পরিণত হয়।
আজ মিজোরাম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তুলনামূলক শান্ত রাজ্যগুলোর একটি।
কিন্তু শুধু একটা চুক্তির কারণে কি এই শান্তি এসেছে?
গবেষক Lalnundika Hnamte খুব সুন্দর একটা কথা বলেছেন। তাঁর গবেষণার মূল বক্তব্য, Mizoram-এ durable peace এসেছে শুধু শক্তিশালী accord-এর কারণে নয়; বরং church, civil society, ছাত্র সংগঠন, সামাজিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা culture of peace তৈরি হয়েছিল।
এই জায়গাটা আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
মিজোরামের মানুষ একসময় শান্তিটাকে নিজেদের বিষয় বানিয়ে ফেলেছিল। শুধু সরকারের project হিসেবে রাখেনি। আমাদের এখানেও সেটা দরকার।
আমি অবশ্যই বলছি না, মিজোরামের মডেল হুবহু পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসতে হবে। দুই অঞ্চলের ইতিহাস, জনসংখ্যা, সাংবিধানিক কাঠামো আলাদা। কিন্তু একটা শিক্ষা তো নেওয়া যায়।
‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে আমরা হয়তো আজ একমত হব না। আগামী দশ বছরেও নাও হতে পারি।
কিন্তু পাঁচটা বিষয়ে একমত হওয়া কি খুব কঠিন? আমি মনে করি না।
প্রথমত, মর্যাদা।
কেউ চাকমা, মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা বা বাঙালি-তার পরিচয়ের কারণে তাকে অপমান করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, সমতা।
রাষ্ট্রের চোখে সবাই নাগরিক। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, বিচার-সব জায়গায় এই সমতা কার্যকর হতে হবে।
তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি।
একটা ছোট জনগোষ্ঠীর ভাষা বাঁচলে বাংলাদেশ ছোট হয়ে যায় না। একটা মারমা উৎসব পালিত হলে বাঙালি সংস্কৃতি দুর্বল হয় না। ম্রো ভাষা টিকে থাকলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে না। বরং এগুলো বাংলাদেশের সম্পদ।
চতুর্থত, আইনের শাসন।
পাহাড়ি কেউ অপরাধ করলে বিচার হবে। বাঙালি কেউ অপরাধ করলে বিচার হবে। রাজনৈতিক সংগঠন অপরাধ করলে বিচার হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কেউ আইন ভাঙলেও জবাবদিহি হতে হবে।
আইন যদি পরিচয় দেখে, বিশ্বাস শেষ হয়ে যায়।
পঞ্চমত, সবার নিরাপত্তা।
এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন পাহাড়ি কৃষক যেন তার জমি নিয়ে নিরাপদ বোধ করেন। একজন বাঙালি ব্যবসায়ী যেন নিজের পরিচয়ের কারণে রাতে ভয় না পান। একজন পাহাড়ি নারী কিংবা বাঙালি নারী, দুজনই যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন। একজন স্কুলপড়ুয়া শিশু যেন তার জাতিগত পরিচয়ের কারণে অপমানিত না হয়। আমি এটাকেই security বলি। শুধু বন্দুকের গুলি না চললেই শান্তি হয় না।
আমার বহুদিনের একটা ভাবনা আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে একটা Inter-Community Dialogue Forum করা যায় কি না। সরকারি কোনো সেমিনারের মতো না। চাকমা থাকবেন, মারমা থাকবেন, ত্রিপুরা থাকবেন, ম্রো থাকবেন, বাঙালি থাকবেন। নারী, তরুণ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, হেডম্যান-কারবারি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, গবেষক-সবাই।
তাঁরা বছরে দুই দিন এসে বক্তৃতা দিয়ে চলে যাবেন না। নিয়মিত বসবেন। ছোট সমস্যা নিয়ে কথা বলবেন।
একটা বাজার নিয়ে সমস্যা হলে কথা বলবেন। একটা স্কুলে জাতিগত উত্তেজনা হলে কথা বলবেন। কারও উৎসব নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হলে কথা বলবেন। কোথাও জমি নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে প্রশাসনের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করবেন।
সব সমস্যা কেন্দ্রীয় সরকার সমাধান করবে, এই চিন্তা থেকে আমাদের কিছুটা বের হতে হবে। অনেক সমস্যার সমাধান স্থানীয় মানুষের কাছেই আছে। শুধু কথা বলার জায়গাটা নেই।
একজন চাকমা কাপ্তাই বাঁধের ইতিহাস যেভাবে বলবেন, একজন বাঙালি হয়তো সেভাবে বলবেন না। একজন পাহাড়ি ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের ইতিহাস যেভাবে মনে রেখেছেন, একজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের স্মৃতি ভিন্ন হতে পারে। একজন বাঙালি পরিবারের অভিজ্ঞতা আবার সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। সবাইকে একই ইতিহাস মুখস্থ করানোর দরকার নেই। বরং দরকার অন্যের ইতিহাসটা শুনতে শেখা। আমার ইতিহাস সত্য হলেই তোমার ইতিহাস মিথ্যা হতে হবে-এই ধারণা থেকে বের হতে হবে। একই ঘটনার ভিন্ন স্মৃতি থাকতে পারে। Reconciliation মানে সব ভুলে যাওয়া না। Reconciliation হলো আমি আমার কষ্ট মনে রাখব, কিন্তু তোমার কষ্টটাও অস্বীকার করব না।
আমরা প্রায়ই বলি, একে অন্যকে tolerate করতে হবে। শব্দটা আমার খুব পছন্দ না। আমি তোমাকে ‘সহ্য’ করছি, এর মধ্যে একটা অদ্ভুত দূরত্ব আছে। আমি বরং বলব, recognise করতে হবে। তোমার পরিচয় আছে। তোমার ইতিহাস আছে। তোমার ভয় আছে। তোমারও এই দেশে ভবিষ্যৎ আছে। আমারও আছে।
আমরা একমত হব না সব বিষয়ে। হওয়ার দরকারও নেই। কিন্তু তুমি আমার শত্রু নও. এই জায়গাটায় পৌঁছাতে হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিচয়ের বিতর্ক হয়তো আরও অনেক দিন চলবে। চলুক। গবেষকরা গবেষণা করুন। রাষ্ট্র তার অবস্থান বলুক। পাহাড়ি নেতারা তাঁদের অবস্থান বলুন। বাঙালি সংগঠনও তাদের কথা বলুক। কিন্তু কথা বলার সময় একটা সীমা থাকা দরকার। কারও পরিচয় অস্বীকার নয়। কারও মানবিক মর্যাদায় আঘাত নয়। কারও ওপর collective guilt চাপানো নয়। কারণ দিনের শেষে সবাইকে একই পাহাড়ে থাকতে হবে। একই রাস্তা ব্যবহার করতে হবে। একই বাজারে যেতে হবে। একই দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের সন্তানদের বড় হতে হবে।
সাড়ে দশ বছরেরও বেশি সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করে আমার অন্তত এইটুকু মনে হয়েছে, পাহাড়ের মানুষ শান্তি চায়। সাধারণ বাঙালিও চায়, সাধারণ পাহাড়িও চায়। যে মানুষটা সকালে দোকান খুলে বসে, যে কৃষক জুমে যায়, যে মা সন্তানকে স্কুলে পাঠান-তাঁদের বেশির ভাগের জীবনে বড় রাজনৈতিক শব্দের চেয়ে নিরাপত্তা, সম্মান আর একটা স্বাভাবিক জীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যা হলো, তাঁদের কণ্ঠ আমরা খুব কম শুনি। আমরা বেশি শুনি চরমপন্থার ভাষা। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য আমাদের নতুন কোনো grand theory দরকার নেই। কয়েকটা সাধারণ বিষয় থেকেই শুরু করা যায়: মর্যাদা, সমতা, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, আইনের শাসন আর সবার নিরাপত্তা।
‘কে আগে এসেছে?’এর উত্তর ইতিহাসবিদেরা খুঁজতে থাকুন। আমি বরং আরেকটা প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, আগামী পঞ্চাশ বছর আমরা কীভাবে একসঙ্গে থাকব? এই প্রশ্নের উত্তর পাহাড়ি-বাঙালি, রাষ্ট্র-সমাজ-সবাইকে মিলেই দিতে হবে। কারণ ইতিহাস আমরা বদলাতে পারব না। কিন্তু ভবিষ্যৎটা এখনো আমাদের হাতে।
তথ্যসূত্র:
Bala, S. (2022). Politics of Peace Agreement Implementation: A Case Study of the Chittagong Hill Tracts (CHT) in Bangladesh. Palgrave Macmillan.
Government of the People’s Republic of Bangladesh. The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, Articles 23A, 27 & 28.
Government of the People’s Republic of Bangladesh & Parbatya Chattagram Jana-Samhati Samiti. (1997, December 2). Chittagong Hill Tracts Accord.
Hnamte, L. (2021). A durable peace with a weak accord in Mizoram. Rising Asia Journal, 1(1).
International Labour Organization. (1957). Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107).
International Labour Organization. (2009). The ILO Convention on Indigenous and Tribal Populations, 1957 (No. 107) and the Laws of Bangladesh: A Comparative Review. ILO.
United Nations. (2007). United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples. UN General Assembly Resolution 61/295.
van Schendel, W. (1992). The invention of the ‘Jummas’: State formation and ethnicity in southeastern Bangladesh. Modern Asian Studies, 26(1), 95–128.