একজন মহান চীনা নেতা ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ঝু রোংজি স্মরণে
![]()
লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন
সাবেক চীনা প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির মৃত্যু আমার জন্য গভীর ব্যক্তিগত বেদনার কারণ। চীন হারাল একজন মহান নেতাকে, আর বিশ্ব হারাল আধুনিক চীনের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ককে। বাংলাদেশও হারাল একজন মহান চীনা বন্ধুকে—যিনি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ সম্পর্ককে আরও গভীর করতে ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।
ঝু রোংজি ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট বেইজিংয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং চীনের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। চীনের অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণ এবং ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) চীনের যোগদানের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এসব অর্জন ইতিহাসবিদ ও বিশ্ববাসী যথাযথভাবেই স্মরণ করবে। তবে আমি তাঁকে কিছুটা ভিন্নভাবে স্মরণ করতে চাই—পরিসংখ্যান বা সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে নয়; বরং বাংলাদেশি নেতাদের চীনা-বাংলা-ইংরেজি দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কিছু মুহূর্তের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশ ও চীনে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এর ফলে কাছ থেকে একজন মহান রাষ্ট্রনায়ককে দেখার এক বিরল সুযোগ পেয়েছিলাম—কোনো ইতিহাসবিদের মতো অতীতের দিকে ফিরে তাঁকে দেখিনি; বরং একজন দোভাষী হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে কথা বলতে শুনেছি।
২০০২ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বাংলাদেশ সফর আজও আমার স্মৃতিতে অত্যন্ত উজ্জ্বল। ২০০২ সালের ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি তিনি ঢাকা সফর করেন, যা ছিল বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, রাষ্ট্রপতি এ.কিউ.এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম. মোর্শেদ খানসহ বাংলাদেশের অন্যান্য শীর্ষ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। সরকারি চীনা নথিতে ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর বৈঠক এবং ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

দুই সরকারের আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয়গুলো এখানে পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। সেগুলো উভয় দেশের সরকারি নথিতে যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে। বরং প্রায় এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে আমার মনে গেঁথে থাকা কয়েকটি ব্যক্তিগত স্মৃতি তুলে ধরতে চাই।
ঢাকায় একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। ঝু কয়েকটি সম্ভাবনার কথা ব্যাখ্যা করেন। তবে তাঁর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে আমার মনে দাগ কেটেছিল। তিনি বলেছিলেন, চীনা ভোক্তাদের রুচি ও প্রয়োজনের উপযোগী পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি বাংলাদেশের বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ যদি এমন পণ্য উৎপাদন করতে পারে, যা সাধারণ চীনা জনগণ কিনতে আগ্রহী, তাহলে চীন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানি করবে।
আমার কাছে তাঁর এই পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক। এটি শুধু বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার একটি কূটনৈতিক উত্তর ছিল না; বরং ছিল একটি অর্থনৈতিক শিক্ষা। বাংলাদেশ কী বিক্রি করতে চায়, শুধু সেটির দিকে তাকিয়ে না থেকে চীনা ভোক্তারা কী কিনতে চান, তা বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হলেই বছরের পর বছর আমি তাঁর সেই পরামর্শের মূল কথাটি বিভিন্ন সেমিনারে তুলে ধরেছি।
আরেকটি স্মৃতি আমার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বঙ্গভবনে আয়োজিত একটি ভোজসভায় পেশায় চিকিৎসক রাষ্ট্রপতি এ.কিউ.এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির সঙ্গে চীনা চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। আমাকে বিস্মিত করেছিল শুধু এই বিষয়টি নয় যে ঝু রোংজি আলোচনায় অংশ নিতে পারছিলেন; বরং তিনি যে ব্যাপক জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন, সেটিই আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল। রাতের খাবারের বড় একটি সময়জুড়ে আলোচনা চলে এবং ঝু চিকিৎসা ও চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ও জ্ঞানগর্ভভাবে মতবিনিময় করেন।
আমি জানতাম, ঝু রোংজির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয় ছিল তড়িৎ প্রকৌশল এবং তিনি সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর আরেকটি দিক আমার সামনে উন্মোচিত হয়েছিল—নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রের বাইরেও নানা বিষয়ে গভীরভাবে বোঝার এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আলোচনা করার অসাধারণ সক্ষমতা।
এই গুণটি আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে।
বিভিন্ন সময়ে তাঁর দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমি লক্ষ্য করেছি, ঝু রোংজি প্রায়ই প্রস্তুতকৃত লিখিত বক্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে স্মৃতি থেকে কথা বলতেন। অথচ তাঁর বক্তব্য ছিল ব্যাপক, সুসংগঠিত এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি তাঁর নিজের অসাধারণ প্রস্তুতি, অভিজ্ঞতা কিংবা তাঁর কর্মকর্তাদের দেওয়া বিস্তারিত ব্রিফিংয়ের ফল ছিল কি না, তা আমি বলতে পারি না। তবে আমার কাছে এটি এমন একজন নেতার পরিচয় বহন করত, যিনি তাঁর দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতেন।
তাঁর আচরণ ছিল দৃঢ়, কিন্তু ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকমের কোমল ও বিনয়ী।
আমার সবচেয়ে অবিস্মরণীয় স্মৃতিগুলোর একটি বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত। ২০০২ সালের জানুয়ারি সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চীনের নির্মিত এই কেন্দ্রের হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কেন্দ্রটি দুই দেশের বন্ধুত্বের একটি দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়।
আমার মনে আছে, কেন্দ্রটির সামনের ছোট লালগালিচা বিছানো মঞ্চে উন্মোচন অনুষ্ঠানের সময় আমি প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি ও তাঁর স্ত্রী লাও আন-এর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাঁকে স্পষ্টভাবে শোনার জন্য আমি যতটা সম্ভব তাঁর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছিলাম।

তিনি নিচু স্বরে চীনা ভাষায় এমন কিছু বলেছিলেন যার অর্থ ছিল—এটি শুধু একটি সম্মেলন কেন্দ্র নয়; এটি চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্বের একটি সেতুও।
সেই কথাগুলো আজও আমার মনে গেঁথে আছে।
এরপর এমন একটি মুহূর্ত এসেছিল, যা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি যখন বাংলাদেশ ত্যাগ করছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সর্বশেষ বাংলাদেশি ব্যক্তি ছিলাম আমি। আমি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদে চীনে ফিরে যাওয়ার শুভকামনা জানাচ্ছিলাম।
তিনি কোমল স্বরে চীনা ভাষায় বললেন—
“你是一个中孟桥 — nǐ shì yí ge Zhōng-Mèng qiáo”
অর্থাৎ, “তুমি চীন-বাংলাদেশের একটি সেতু।”
সেই মুহূর্তে আমি শুধু একজন দোভাষী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করছিলাম। তখন ভাবতেও পারিনি, তাঁর সেই কয়েকটি শব্দ আমার সারা জীবনের স্মৃতিতে থেকে যাবে।
আজ তাঁর মৃত্যুর পর সেই কথাগুলোর অর্থ আমার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে উঠেছে।
সরকারি দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নিজে ছবি তোলার সুযোগ আমার ছিল না। তবে বছরের পর বছর ধরে সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব অনুষ্ঠানের অনেক ছবি ও ভিডিওচিত্র আমি সংগ্রহ করেছি। এখন সেগুলো আমার কাছে সাধারণ ছবির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। এগুলো একটি সময়কে, একটি ইতিহাসকে এবং এমন কিছু মানুষকে ধরে রেখেছে, যারা আজ আর আমাদের মাঝে নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে আমি প্রায়ই সেই দিনগুলোর কথা মনে করি। কারণ প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির দোভাষী হিসেবে যেসব বাংলাদেশি নেতার সঙ্গে আমি কাজ করেছি, তাঁদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার—তাঁরা সবাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ঝু রোংজির মৃত্যুর খবর শোনার পর তাঁদের এবং সেই সময়গুলোর স্মৃতি আমার মনে একের পর এক ঝলসে উঠতে থাকে—যেন অমূল্য হীরার মতো।
বাংলাদেশের সঙ্গে ঝু রোংজির সম্পর্ক তাঁর ঢাকা সফরের মধ্যেই শেষ হয়নি। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারি সফরে চীন যান এবং বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি দোভাষী হিসেবে আমিও পাঁচ দিনের সেই রাষ্ট্রীয় সফরে প্রতিনিধিদলের অংশ হওয়ার এবং উভয় পক্ষের মধ্যে দোভাষীর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলাম। একই বছরে দুই নেতার পারস্পরিক সফর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে নির্দেশ করে।
বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের বাইরেও ঝু রোংজির বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিস্তৃত ছিল। ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা সফরের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ছিল এর আরেকটি উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
তিনি যে সম্পর্ককে আরও গভীর করতে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের বিভিন্ন প্রজন্মের নেতৃত্বের মধ্য দিয়েও অব্যাহত রয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতা এখন নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের ২২ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করেন। ২৬ জুন বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই নেতা যৌথভাবে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। একই সফরে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
আমার কাছে এই অগ্রগতি অতীতের সঙ্গে বিচ্ছেদ নয়; বরং ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।
ঝু রোংজির মতো নেতারা রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্যিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও বাস্তবভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যে সম্পর্ককে আরও গভীর করতে ভূমিকা রেখেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব সেই সম্পর্ককে ক্রমাগত এগিয়ে নিয়েছে। আজ সেই সম্পর্ক এমন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যাকে উভয় দেশই নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের একটি কমিউনিটি নির্মাণ হিসেবে বর্ণনা করছে।
তাই ঝু রোংজি শুধু বাংলাদেশের সফরকারী একজন সাবেক চীনা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ গঠনপর্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বকে বাস্তব রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
আমি সব বাংলাদেশির হয়ে কথা বলার দাবি করি না। তবে আমি বিশ্বাস করি, তাঁর অবদান সম্পর্কে যারা জানেন, বিশেষ করে যারা তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছেন কিংবা তাঁর বাংলাদেশ সফর প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁদের অনেকেই আমার মতোই এই শোক অনুভব করবেন।
তিনি আমার আত্মীয় ছিলেন না। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকও ছিলেন না। সামাজিকভাবে তাঁর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। আমি ছিলাম শুধু একজন বাংলাদেশি দোভাষী, যিনি ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য পেয়েছিলেন।
তবুও তাঁর মৃত্যুর খবর শোনার পর আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
সম্ভবত এটিই একজন মহান নেতার প্রভাবের একটি মাপকাঠি—তাঁর প্রভাব নাগরিকত্ব বা আত্মীয়তার সীমা অতিক্রম করে এমন মানুষের হৃদয়েও পৌঁছাতে পারে, আর একজন নেতার বলা কিছু কথা কয়েক দশক পরও মানুষের মনে জীবন্ত থাকতে পারে।
আমি ঝু রোংজিকে স্মরণ করব একজন মহান চীনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, যিনি সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের এক ঐতিহাসিক সময়ে চীনকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করব সেই কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে, যাঁর কয়েকটি কথা এক বাংলাদেশি দোভাষীকে অনুভব করিয়েছিল যে তার ছোট্ট পেশাগত দায়িত্বও হয়তো আরও বড় কোনো কাজে অবদান রাখতে পারে।
“তুমি চীন-বাংলাদেশের একটি সেতু।”
আজ প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি আমাদের মাঝে নেই।
কিন্তু সেই সেতু রয়ে গেছে।
তাঁর স্মৃতি চীন ও বাংলাদেশের জনগণের জন্য চিরকল্যাণের হয়ে থাকুক। আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা জোরদারে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হোক। আর যে সেতুকে তিনি শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই সেতু যেন চীন ও বাংলাদেশের জনগণকে আরও শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও অভিন্ন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বিদায়, প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি।
আপনার সেই কথাগুলো আজও আমার হৃদয়ে রয়ে গেছে।
লেখক: অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন, পিএসসি, এমবিএ, এমডিএস; চীনা ভাষায় স্নাতক, বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি (BLCU); অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর, ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি; চীনা–বাংলা–ইংরেজি দোভাষী, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের গবেষক ও লেখক; চীনা ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা; মহাসচিব, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (WSCC); চায়না-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৩-এর প্রাপ্ত গবেষক।