কাদা থেকে একের পর এক বেরিয়ে আসছে লাশ, মৃত্যু ছাড়াল ৩৯০

কাদা থেকে একের পর এক বেরিয়ে আসছে লাশ, মৃত্যু ছাড়াল ৩৯০

কাদা থেকে একের পর এক বেরিয়ে আসছে লাশ, মৃত্যু ছাড়াল ৩৯০
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ৩৯০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এক হাজার ৪০০ জনের বেশি। আকস্মিক বন্যায় নদীর পানির সঙ্গে কাদা ও পাথরের স্রোত নেমে এসে স্থানীয় শহর, জনপদ ও উপত্যকাগুলো লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) উদ্ধারকারীরা কাদার মধ্যে নেমে নিখোঁজদের সন্ধান চালান। নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে নিহত হয়েছেন অন্তত তিনজন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দুর্যোগের একদিন পর বৃহস্পতিবার বিকালে তিব্বতের ভূমিধসকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। সেখানে তিনি জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে নিখোঁজ ৯১০ জনের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনের বেশি দেশের পর্যটক ও নাগরিক নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন। এর মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ১০০ জন চীনা নাগরিক রয়েছেন।

অন্যদিকে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

দুর্যোগকবলিত এলাকায় পৌঁছানোই উদ্ধারকারীদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মিনেল ফার্নান্দেজ জানান, সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছে জীবিতদের উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছে। এসব হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকা থেকে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে পাঁজর ভেঙে যাওয়া এবং ত্বকে দগ্ধ হওয়ার মতো গুরুতর আঘাত রয়েছে।

নেপালে উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে জীবিতদের সন্ধান এবং জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছে দিচ্ছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া হাজারো মানুষকে উদ্ধারে এই অভিযান চলছে। এলাকাটি তিব্বতের লাসা থেকে কাঠমান্ডু যাতায়াতকারী পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়।

বুধবারের ভিডিও ফুটেজে দ্রুতগতির পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে গিরং সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েক ডজন মানুষ ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। সংবাদ সংস্থাগুলো ফুটেজটি যাচাই করেছে। নেপালের দিকে নদীর নিম্নপ্রবাহে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে।

নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার স্থানে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি বাড়ছে এবং যেকোনো সময় সেটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, প্রতিবেশী ভারত সরবরাহ করা তাঁবু, খাবার ও ওষুধ হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য অংশ নিয়েছেন।

বন্যার কারণে ভারতের নেপাল সীমান্তবর্তী বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড রাজ্য থেকেও হাজারো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারণ বন্যার পানি গান্ডাক নদীর অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটের বিদুরের পরিস্থিতি দেখতে সড়কপথে রওনা হয়েছেন বলে তার কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে।

যেভাবে শুরু হলো বিপর্যয়

প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, শুরুতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে যে কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ আকস্মিকভাবে ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি। এর পরপরই ব্যাপক ধ্বংসাবশেষের তীব্র স্রোত বানের মতো নেমে আসে।

প্ল্যানেট ল্যাবসের প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের একটি ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে ধ্বংসাবশেষসহ প্রবল স্রোত তৈরি হয়। ঘটনাস্থলটি নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।

দুর্যোগকবলিত উপত্যকাগুলোতে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন ঘন কাদায় ঢেকে গেছে। আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে ধসে পড়া বাড়ি, পানিতে ডুবে থাকা গাড়ি এবং প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া একটি ধাতব সেতু দেখা গেছে।

রাসুওয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকি বলেন, যেদিকেই তাকাই, ধ্বংসযজ্ঞ। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পাঁচজন আত্মীয় নিখোঁজ।

দুর্যোগের সময় তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর হ্রদে তীর্থযাত্রায় থাকা লোকজনও বিপদের মধ্যে পড়েছেন। হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে উচ্চভূমির এসব স্থান পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।

আন্তর্জাতিক সহায়তা

ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, তারা একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক পরামর্শককে নেপালে পাঠাচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বন্যাকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কানাডার কর্মকর্তারা পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দফতরের প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে জাতিসংঘের বৈশ্বিক জরুরি তহবিল সিইআরএফ থেকে ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এর আগে জানিয়েছিলেন, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও সহায়তাকর্মী পাঠানো হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, দুর্গম এলাকায় স্থানীয় অবকাঠামো ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ছে

এই ভয়াবহ বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে বলে মনে করেন জলবায়ু ও জননীতি বিশেষজ্ঞ সুনীল আচার্য।

কাঠমান্ডু থেকে তিনি বলেন, এটি শুধু একটি অনির্দেশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারিতে বসবাসের বাস্তবতা এই বিপর্যয়ের মাধ্যমে নির্মমভাবে ফুটে উঠেছে।

তার মতে, এমন দুর্যোগ ঠেকাতে নেপাল একা সীমিত পরিসরে কাজ করতে পারে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দেশটির পর্যাপ্ত সম্পদ নেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *