সীমান্ত নিরাপত্তায় নতুন অধ্যায়, বিজিবির ‘ড্রোন ওয়ারফেয়ার’ স্কুলের যাত্রা শুরু
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্তে নজরদারি জোরদার, চোরাচালান প্রতিরোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং আকাশপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে বিজিবির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘Shimanto School of Surveillance and Drone Warfare (SSSDW)’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সিলেটে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
উদ্বোধনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী SSSDW-এর কমপ্লেক্স ও ডিসপ্লে সেন্টার পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত কমান্ড্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন বিশেষায়িত এ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় ড্রোন প্রযুক্তির আভিযানিক প্রয়োগ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেন।

সীমান্ত নজরদারিতে প্রযুক্তির নতুন ব্যবহার
বর্তমান সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রচলিত জনবলনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, বিস্তৃত সীমান্ত অঞ্চল, দুর্গম চর ও নদীঘেরা সীমান্তে দ্রুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করতে ড্রোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজিবির নতুন এ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও সুসংহত করার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখানে ড্রোন পরিচালনা, নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সীমান্ত নিরাপত্তা কার্যক্রমে এসব প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজিবির প্রশিক্ষিত ড্রোন পাইলটদের অংশগ্রহণে সীমান্ত নিরাপত্তায় ড্রোন প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে বিশেষ ‘Drone Maneuver’ মহড়াও প্রদর্শন করা হয়।
মহড়ায় ড্রোনের মাধ্যমে বিজিবির সিক্সম্যান পেট্রোল টিমের আভিযানিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ড্রোন ব্যবহার করে সন্দেহভাজন চোরাকারবারীদের শনাক্ত ও আটকের প্রক্রিয়াও প্রদর্শন করা হয়।

চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন
সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধ বিজিবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দুর্গম সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারীরা অনেক সময় পাহাড়ি পথ, জঙ্গল কিংবা নদীপথ ব্যবহার করে অবৈধভাবে পণ্য পরিবহন করে থাকে। এসব এলাকায় দ্রুত নজরদারি ও সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করতে ড্রোন প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মহড়ায় দেখানো হয়, ড্রোন ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং চোরাচালানবিরোধী অভিযানে টহলদলকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব।
এ ছাড়া সীমান্তে অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার চেষ্টা প্রতিহত করতেও ড্রোনের ব্যবহারিক প্রয়োগ তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত পরিস্থিতি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি প্রদর্শিত হয়।

অপরিচিত ড্রোন শনাক্তে Anti-Drone System
বর্তমানে শুধু স্থলসীমান্ত নয়, আকাশপথেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সীমান্ত এলাকায় অপরিচিত বা অননুমোদিত ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
SSSDW-এর মহড়ায় Anti-Drone System-এর ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখানো হয়। এর মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় অপরিচিত বা অননুমোদিত ড্রোন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা তুলে ধরা হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমান্ত নিরাপত্তার প্রচলিত ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজিবিকে প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে।

Mavic Drone-সহ বিভিন্ন ড্রোনের আকর্ষণীয় প্রদর্শনী
মহড়ার শেষ পর্যায়ে বিজিবিতে সংযোজিত Mavic Drone-সহ বিভিন্ন ধরনের ড্রোনের সমন্বয়ে আকর্ষণীয় ‘Drone Fly-Past’ প্রদর্শন করা হয়।
এর মাধ্যমে সীমান্ত নজরদারি, চোরাচালান প্রতিরোধ, পুশ-ইন প্রতিহতকরণ এবং সার্বিক সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ড্রোন প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের সক্ষমতা তুলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় ড্রোনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একই সঙ্গে নজরদারির পরিধি বাড়ানো এবং সীমিত সময়ে অধিক এলাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে সীমান্তরক্ষীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভিযান পরিচালনাও আরও তথ্যভিত্তিক হতে পারে।

দক্ষ জনবল তৈরিতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, SSSDW প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য হলো সীমান্ত নজরদারি ও ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরি করা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল সরঞ্জাম সংযোজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এসব প্রযুক্তি সঠিকভাবে পরিচালনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের অভিযানের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য প্রশিক্ষিত জনবলও প্রয়োজন।
নতুন এই বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সেই প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে পাহাড়ি, দুর্গম ও বিস্তৃত সীমান্ত এলাকায় নজরদারি কার্যক্রমকে প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বিত করার মাধ্যমে বিজিবির সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তির পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও দ্রুততা ও কার্যকারিতা আনার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশের দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবিকে একদিকে যেমন মানবসম্পদ ও প্রচলিত সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করতে হয়, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও যুক্ত করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় SSSDW প্রতিষ্ঠা সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে দক্ষ ড্রোন পাইলট ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত নজরদারির আধুনিক কৌশল আরও বিস্তৃত হবে। ফলে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অন্যান্য সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবির সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
SSSDW-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রার মধ্য দিয়ে সীমান্ত নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহারকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও কার্যকর হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।