মেজর (অব.) ফেরদৌস কায়সারকে কেন বিতর্কিত করতে চায় পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা?
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ইতিহাস ঘাঁটলে এমন কিছু সেনা কর্মকর্তার নাম সামনে আসে, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে লড়েছেন। তেমনই একজন সাহসী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তার নাম মেজর (অব.) ফেরদৌস কায়সার খান। পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে তিনি ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন দক্ষ মেজর হিসেবে তিনি পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সন্ত্রাসী দমনে অসংখ্য অপারেশনে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) অফিসার ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, মানবসম্পদ, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্বও তিনি সফলভাবে পালন করেন।
সন্তু লারমা ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণের পর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে কল্পনা অপহরণ এবং লোগাঙ গণহত্যার বিষয়গুলোকে ‘বিতর্কিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত বিষয়’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এতেই প্রমাণিত হয় যে, এই নিখোঁজের ঘটনাটি রাজনৈতিক ফায়দা লুটার একটি কৌশল মাত্র ছিল। সূত্র- (পাহাড়ের রুদ্র কণ্ঠ, দ্বিতীয় সংখ্যা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, ২০০৬, পৃ. ৬০ দ্রষ্টব্য)।
পার্বত্য অঞ্চলে অপহরণের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। কল্পনা চাকমার নিখোঁজ হওয়াকে একক ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে অপহরণ এবং গুমের সংস্কৃতি মূলত পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর একটি নিয়মিত রণকৌশল। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পাহাড়ে বাঙালি ও পাহাড়ি মিলিয়ে মোট ২,৩৮৯ জন মানুষ অপহৃত ও গুম হয়েছেন। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির পরবর্তী দুই দশকেও এই ধারা অব্যাহত থাকে, যার শিকার হন আরও প্রায় দেড় হাজার মানুষ।
বর্তমানে তিনি করপোরেট সেক্টরে, বিশেষ করে এ কে খান কোম্পানিতে সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ভূমি সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং নিরাপত্তা অপারেশনের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অথচ, এই নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা ও তার সুদীর্ঘ গৌরবময় ক্যারিয়ারকে কলঙ্কিত করতে এবং তাকে রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির কূটচালে ফাঁসাতে তিন দশক ধরে এক পরিকল্পিত খেলা চলছে। পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কেন এবং কীভাবে এই সৎ অফিসারকে বিতর্কিত করার নোংরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক রহস্য।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত ‘কল্পনা চাকমা নিখোঁজ’ ইস্যুটি। ১৯৯৬ সালের ১১ জুন মধ্যরাতে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার লাইল্যাঘোনা গ্রাম থেকে হিল উইমেন ফেডারেশনের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদিকা কল্পনা চাকমা নিখোঁজ হন। (সূত্র- ডিফেন্স ফর রিসার্চ ফোরাম, বাংলাদেশ)
এই ঘটনাকে পুঁজি করে দীর্ঘ তিন দশক ধরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একটি একমুখী ও একপেশে প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে বারবার সুকৌশলে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মেজর (অব.) ফেরদৌস কায়সারের নাম। কিন্তু ঘটনার সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং তৎকালীন গোয়েন্দা ও তদন্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই তথাকথিত অপহরণের ঘটনাটি যতটা না মানবাধিকারের, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল তৎকালীন আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, উপদলীয় কোন্দল এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তি’র আসল রহস্য আড়াল করার হাতিয়ার।
ঘটনার সূত্রপাত বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাল দিনগুলোতে।
সেই সময়ে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে এক চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছিল। শান্তিবাহিনীর প্রকাশ্য রাজনৈতিক উইং ‘পাহাড়ী গণপরিষদ’ (পিজিপি) তাদের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য বিজয় কেতন চাকমাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। অপরদিকে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থানে ছিলেন দীপংকর তালুকদার, যাকে তৎকালীন সাধারণ পাহাড়ি এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সমর্থন জানিয়েছিল। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে শান্তিবাহিনী ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো সাধারণ ভোটার ও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর চরম দমনপীড়ন শুরু করে।
পরিসংখ্যান ও সমসাময়িক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেই নির্বাচনের আগে ও পরে পার্বত্য অঞ্চল থেকে প্রায় ৩৫ জন আওয়ামী লীগ সমর্থককে অপহরণ ও হয়রানি করা হয়েছিল। এই বৈরী পরিবেশেও কল্পনা চাকমা হিল উইমেন ফেডারেশনের নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে গোপনে বা প্রকাশ্যে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছিলেন বলে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। শান্তিবাহিনীর কট্টর লাইনের বাইরে গিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক মেরুকরণে অংশ নেওয়াটা তাদের নিজস্ব কোন্দলকে উস্কে দিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে, তাকে এই প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য তৎকালীন পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা একাধিকবার হুমকিও প্রদান করে। ফলে কল্পনা চাকমার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিশোধপরায়ণতার তত্ত্বটি সবচেয়ে জোরালো ভিত্তি পায়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে। (সূত্র-পার্বত্যনিউজ)
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা খুব ভালো করেই জানত যে, পাহাড়ে তাদের সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মনোবল ভাঙা জরুরি। আর সেনাবাহিনীর মনোবল ভাঙার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মাঠপর্যায়ের কঠোর ও আপসহীন অফিসারদের বিতর্কিত করা। মেজর (অব.) ফেরদৌস কায়সার খান ছিলেন তেমনই একজন আপসহীন অফিসার, যিনি পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। তাকে যদি একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বা ‘অপহরণ’ এর মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে একদিকে যেমন সেনাবাহিনীর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রকে কোণঠাসা করা সহজ হবে। এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কল্পনা চাকমার ভুয়া ও বানোয়াট ইস্যু তৈরি করে এই বীর কর্মকর্তাকে খলনায়ক বানানোর অপচেষ্টা চালানো হয়। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রোপাগান্ডা ছড়ায় যে, রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী এই অপহরণের সাথে জড়িত, অথচ তারা সম্পূর্ণ চেপে যায় যে শান্তিবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনী সহিংসতার শিকার ছিলেন স্বয়ং কল্পনা চাকমা।
অনেকেই ধারণা করেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির আসল রহস্য ও তার ভেতরের কূটচাল জনগণের সামনে যাতে ফাঁস না হয়, সেজন্যও মেজর ফেরদৌসের মতো অফিসারদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল। শান্তিচুক্তি করার পেছনে তৎকালীন সরকারের যে রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল, তার সাথে পাহাড়ের প্রকৃত নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার এক ধরনের আপস করা হয়েছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। এই শান্তিচুক্তির পথ সুগম করতে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সন্তুষ্ট করতে তৎকালীন রাজনীতির শীর্ষ মহল থেকে মাঠপর্যায়ের কট্টর দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় করার একটা অদৃশ্য চাপ ছিল। রাজনীতির এই নোংরা কূটচালে ফাঁসিয়ে মেজর ফেরদৌসের মতো একজন প্রতিশ্রুতিশীল অফিসারের সম্ভাবনাময় সামরিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল, যাতে পাহাড়ে তথাকথিত ‘শান্তি’র নামে একমুখী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যায়।
আজ তিন দশক পর এসে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এবং দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে এই সত্যটি অনুধাবন করতে হবে। পাহাড়ে এতদিন ধরে কারা অশান্তি জিইয়ে রেখেছিল এবং কারা নিজেদের আখের গোছাতে একজন বীর সেনানীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে, তা আজ স্পষ্ট। মেজর (অব.) ফেরদৌস কায়সার খানের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই পরিকল্পিত অপপ্রচার আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি দীর্ঘমেয়াদী চক্রান্তের অংশ।
যারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন ও ক্যারিয়ার বাজি রেখেছিলেন, তাদের এভাবে রাজনীতির দাবার গুটি বানিয়ে জীবন শেষ করে দেওয়ার নেপথ্য কারিগরদের মুখোশ উন্মোচন করা আজ সময়ের দাবি। তবেই পাহাড়ের আসল সত্য উন্মোচিত হবে এবং দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের ত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।