মহালছড়ির দুর্গম পাহাড়ে মা-নবজাতকের সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর ধাত্রীবিদ্যা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
দুর্গম পাহাড়ি জনপদে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মহালছড়ি জোন। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আয়োজিত তিন সপ্তাহব্যাপী ধাত্রীবিদ্যা ও নার্সিং প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে দুর্গম এলাকার ২৫ জন প্রশিক্ষণার্থীর হাতে সনদপত্র ও প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ির মহালছড়ি জোনের আয়োজনে প্রশিক্ষণের আনুষ্ঠানিক সমাপনী ও সনদ বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে নির্বাচিত ২৫ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে আনুষ্ঠানিক সনদপত্রের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ফার্স্ট এইড কিট প্রদান করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহালছড়ি জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ আল-জাবির আসিফ।
তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তাৎক্ষণিক উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা গেলে জরুরি মুহূর্তে মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য কার্যকর রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

তিন সপ্তাহের নিবিড় প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ, প্রসবকালীন বিভিন্ন জটিলতা মোকাবিলা, প্রসব-পরবর্তী সময়ে মা ও নবজাতকের পরিচর্যা এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া প্রশিক্ষণে সর্পদংশনের শিকার রোগীকে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান, জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিভিন্ন কৌশল শেখানো হয়। ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা নিজ নিজ এলাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গর্ভবতী নারীদের সময়মতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতের বেলা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে প্রসবকালীন জটিলতায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ধাত্রী ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মী তৈরি করা মা ও নবজাতকের নিরাপত্তায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশিক্ষণ শেষে সনদপত্র ও চিকিৎসা সামগ্রী হাতে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন প্রশিক্ষণার্থীরা। তারা জানান, প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় প্রসবকালীন সময়ে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাৎক্ষণিক সঠিক সিদ্ধান্ত ও প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে মা ও নবজাতক উভয়েই ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা নিজ নিজ এলাকায় জরুরি মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়াতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

প্রশিক্ষণার্থীরা আরও জানান, সনদের পাশাপাশি দেওয়া ফার্স্ট এইড কিট মাঠপর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দিতে তাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। দুর্গম এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে তারা অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে চান।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহালছড়ি জোনের এ উদ্যোগ দুর্গম এলাকার মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অনুষ্ঠানে মহালছড়ি জোনের পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক, জ্যেষ্ঠ নার্স, প্রশিক্ষক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জনপদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মহালছড়িতে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় তিন সপ্তাহের এই প্রশিক্ষণও সেই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের একটি প্রশংসনীয় সংযোজন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।