চাহিদা বাড়ায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট থেকে রিসোর্ট

চাহিদা বাড়ায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট থেকে রিসোর্ট

চাহিদা বাড়ায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট থেকে রিসোর্ট
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

  • ছিল না কোনো সংস্থার অনুমতি
    স্থাপনাটি ভেঙতে দুই দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল
    মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে দোকানপাটসহ ১৫০ অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট

তারেকুর রহমান, কক্সবাজার

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নকশা অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছিল উখিয়ার টুপটুপ রেস্টো নামের সেই রেস্টুরেন্ট। মূলত একটি উপকূলীয় রেস্টুরেন্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সমুদ্র এবং পাহাড়ের চমৎকার মেলবন্ধনের কারণে পর্যটকদের কাছে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সেই চাহিদাকে পুঁজি করে এর ওপর কাঠের আবাসন কাঠামো তৈরি করে রিসোর্ট ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়। তিন তলা ভবনের রিসোর্টটিতে ছিল না ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ও পরিবেশের ছাড়পত্র। এ কারণে স্থাপনাটি ভেঙতে দুই দফা নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। এ কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানাও করে।

এদিকে কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, মেরিন ড্রাইভের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে দোকানপাটসহ ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট চিহ্নিত করেছে কাউক। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হবে।

তিনি আরও বলেন, উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টো ও রিসোর্টের কোনো অনুমোদন ছিল না। স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার জন্য আগেও দুই দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার চার মাসের মধ্যে আমি এসব অবৈধ স্থাপনার বিষয়ে অবগত হয়েছি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফিন্স কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, আমাদের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানিয়েছেন, টুপটুপ রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। জুন মাসে তাদের সতর্ক করাও হয়েছিল।

সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন আরও বলেন, কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে যেগুলোর অনুমোদন নেই, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টসহ আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, মেরিন ড্রাইভ সড়কে শুধুমাত্র সি পার্ল বীচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পার ছাড়পত্র বা অনুমতি আছে। আর কোনো হোটেল-রিসোর্টের অনুমতি নেই। যে সব হোটেল-রিসোর্ট অনুমতিহীন তার বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালাই। নোটিশ ও মামলাও করা হয়।

তিনি জানান, রেস্টুরেন্ট ও হোটেল–মোটেলকে ছাড়পত্র পেতে হলে প্রথমত কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভবনের নকশার অনুমোদন লাগে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট থাকা লাগে। এসবের কোনোটিই টুপটুপ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের ছিল না। ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্ট পরিচালনা বন্ধ করতে গত এপ্রিলে টুপটুপ রেস্টো ও রিসোর্টকে নোটিশ দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। নির্দেশনা না মানায় তাদের ১ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়।

এদিকে ওই এলাকার আশপাশের দোকানি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সংস্থাকে মাসোহারা দিয়ে চলে অনুমোদনহীন এসব রিসোর্ট।

কক্সবাজারের পরিবেশবাদীরাও একই কথা বলছেন। তিন সংস্থার অনুমতি না থাকলে কীভাবে কক্সবাজারের রিসোর্টগুলো পরিচালনা করা হয় তাদের প্রশ্ন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রশাসনের ছাড়পত্র ছাড়াই মেরিন ড্রাইভ সড়কের আশপাশে শত শত কটেজ, রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। এখনো নতুন নতুন স্থাপনা নির্মিত হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর তদারকি চোখে পড়ে না। অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মাসিক মাসোহারা বা অনৈতিক সুবিধা দিয়ে এসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। এরপরও ওই এলাকায় টুপটুপসহ অনেক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধে উদ্যোগ নিতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন এলাকায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনার দায়ে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে নোটিশ অমান্য করায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে এবং ২টি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

জরিমানা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কলাতলীর জিডি সমুদ্র বিলাসকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, উখিয়ার সি পার্ল বীচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পাকে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টকে ৪ লাখ টাকা, হোটেল স্যুট সাদাফকে ৩ লাখ টাকা, কলাতলীর হোটেল জানা ডাডাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া রামুর সাম্পান বিচ রিসোর্ট, মায়াবী বীচ রিসোর্ট ও টাইটান হোটেলকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করে, টেকনাফের জাহাজপুরা ক্যাসলকে ১ লাখ ১ হাজার টাকা এবং উখিয়ার সি পার্লস বীচ রিসোর্টকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অন্যদিকে নোটিশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো হোটেল ইনানী লং বে, আরনিম রিসোর্ট, ওশান পার্ল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, বে ফ্রেন্ডস রিসোর্ট, হিমছড়ির বে হিল, ছুটি রিসোর্ট ও সাম্পান রিসোর্ট। এ ছাড়া নামহীন নির্মাণাধীন তিনটি হোটেলকে নোটিশ দেওয়া হয় এবং এর মধ্যে একটির বিরুদ্ধে মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

টুপটুপ যাত্রা শুরু

২০২২ সালের জুনে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মৌজায় গিয়াস উদ্দিন গং থেকে মেরিনড্রাইভলাগোয়া ১০ শতক জমি ক্রয় করেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা টিপু সুলতান মিয়ার ছেলে তানভীর সুলতান মিয়া। শুরুতে টুপটুপ রেস্টো নামে রেস্টুরেন্টটি তৈরি করা হয়। পরে পর্যটকদের চাহিদা বাড়ায় ২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠানটি আবাসিক করে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এর নিচতলায় রেস্টুরেন্ট এবং ওপরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় পর্যটকদের রাত্রিযাপনের জন্য কাঠের তৈরি গেস্টরুম বা এলিট ডিলাক্স কাপল রুমের ব্যবস্থা ছিল। শুরুতে টুপটুপ রিসোর্টের কক্ষ ভাড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকা। দিন দিন চাহিদা বাড়ায় পরে সর্বনিম্ন ছয় থেকে পনেরো হাজার টাকার মধ্যে ভাড়া নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে তানভীর সুলতান মিয়া তার বন্ধু চট্টগ্রামের বাসিন্দা নিয়াজ মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে রিসোর্টের ব্যবসা বড় করে তোলেন বলে জানা গেছে। তারা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম করে।

মালিকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ব্যবস্থাপক গ্রেপ্তার

টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদ ও ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শনিবার রাতে উখিয়া থানায় মামলাটি করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশীষ কুমার সূত্র ধর। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে ডিএনএ পরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ততক্ষণ মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কক্সবাজারের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে সেখানেই ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটি ইতোমধ্যে তদন্তকাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।

তিনি জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস, উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের প্রতিনিধি থাকবেন।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নয়জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন, ঢাকার বনশ্রী এলাকার ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভি (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), ফাইজান আহমেদ (৫), সাবরিন (২৩), জেরিফ (১৮), নাফিস্তা মীম (২৭), নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) ও ফারিহা কবির (৩৩)। নিহত অপর একজনের পরিচয় জানা যায়নি।

এ ঘটনায় অন্তত ৭ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. সুবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আরেকজনকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *