পার্বত্য চট্টগ্রামে শিল্পায়ন, জমি হস্তান্তর আইন সংস্কারে লিগ্যাল নোটিশ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে দ্রুত শিল্পায়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
১৯৮৯ সালের তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ ধারায় জমি ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পরিষদের পূর্বানুমোদনসংক্রান্ত বিধান পর্যালোচনা, সংশোধন বা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে এই নোটিশে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মাহমুদুল হাসান মামুন রোববার (২৫ অক্টোবর) এই লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। তার বক্তব্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি সম্ভাবনা এবং চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক যোগাযোগকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে অঞ্চলটিকে একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস ও রপ্তানিমুখী শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃহৎ আকারের শিল্পায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি— এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে লিগ্যাল নোটিশে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে কার্যকর সড়ক যোগাযোগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, গুদামজাতকরণ সুবিধা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা কোনো অঞ্চলকে শিল্পোৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। এ বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকেজিং শিল্প, লজিস্টিকস হাব এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নে পরিবেশগত সুরক্ষা, পাহাড়ি ভূমির বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, ভূমির মালিকানা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নোটিশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জেলা প্রশাসকদের বিবাদী করা হয়েছে।
১৯৮৯ সালের আইনের ৬৪ ধারা নিয়ে আপত্তি
নোটিশে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯-এর ৬৪ ধারার ভূমি-সংক্রান্ত বিধান নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি আইনভান্ডারে প্রকাশিত বিধান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া নির্ধারিত এলাকার জমি ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় বা অন্যভাবে হস্তান্তরের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আইনে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমও উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবী মামুনের দাবি, ভূমি হস্তান্তরের বিদ্যমান অনুমোদনব্যবস্থা বিনিয়োগ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। তার মতে, এই বিধানগুলো যুগোপযোগীভাবে পর্যালোচনা করে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ আইনজীবীর প্রস্তাব, ভূমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যেন প্রকৃত জমির মালিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে, বৈধ বিনিয়োগকারীরা হয়রানিমুক্তভাবে জমি ব্যবহারের সুযোগ পান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও যথাযথ সংরক্ষিত হয়।
‘অচল সম্পদ’ থেকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে ভূমি
নোটিশে জমির অর্থনৈতিক ব্যবহার ও মালিকদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। নোটিশদাতার যুক্তি, জমি হস্তান্তর ও বিনিয়োগের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা থাকলে ভূমির উৎপাদনশীল ব্যবহার ব্যাহত হতে পারে এবং জমির মালিকেরা সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, বৈধ মালিকানা নিশ্চিতকরণ, সহজতর নিবন্ধনব্যবস্থা এবং পরিবেশসম্মত শিল্পায়নের মাধ্যমে জমিকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তবে ভূমি হস্তান্তরের বিধিনিষেধ সংশোধনের পাশাপাশি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমির অধিকার, বিরোধপূর্ণ মালিকানা, বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বেকারত্ব দূরীকরণ ও স্থায়ী শান্তির প্রশ্ন
নোটিশে পার্বত্য অঞ্চলের কর্মসংস্থান সংকটকে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নোটিশদাতার মতে, স্থানীয় তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অন্যদিকে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, পর্যটন, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাত সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি তরুণদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণকে শান্তি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কৌশলের অংশ করতে হবে। কেবল নিরাপত্তাকেন্দ্রিক উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নোটিশে আরও যুক্তি দেওয়া হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের অভাব সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তরুণদের নিয়োগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সে কারণে স্থানীয় জনগণের জন্য বৈধ আয়ের সুযোগ সৃষ্টি, সামাজিক আস্থা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে স্থায়ী শান্তির সহায়ক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে বেকারত্বকে পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সংঘাতের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংঘাতের রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, ভূমি-সংক্রান্ত ও নিরাপত্তাগত মাত্রাও রয়েছে। ফলে টেকসই শান্তির জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সংলাপ, ন্যায়বিচার, অধিকার সুরক্ষা ও কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংবিধানের আলোকে সম্পত্তির অধিকার ও সমান সুযোগের দাবি
নোটিশে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯, ২৭, ৩১, ৩২ ও ৪২ অনুচ্ছেদের আলোকে সম্পত্তির অধিকার, আইনের আশ্রয়, সুযোগের সমতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে আইনের দ্বারা আরোপিত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে সব নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর ও অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
নোটিশদাতার বক্তব্য, সম্পত্তির অধিকার ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্রশ্নে বিদ্যমান বিধানগুলোকে সাংবিধানিক নীতিমালা এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তবে সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকার আইনগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে স্বীকৃত। তাই ৬৪ ধারার বিধান সরাসরি অসাংবিধানিক কি না, তা কেবল নোটিশের দাবির ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না; বিষয়টি আইনগত পর্যালোচনা ও প্রয়োজনে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি
নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রধান দাবিগুলো হলো—
ভূমি হস্তান্তরসংক্রান্ত বিধান পর্যালোচনা: তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ ধারার বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী বিধানগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য যুগোপযোগী নীতিমালা: চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের নৈকট্য কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশসম্মত শিল্পাঞ্চল, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুদামজাতকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া।
বৈধ জমি নিবন্ধন ও হস্তান্তর সহজ করা: জমির মালিকানা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং পরিবেশগত সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে বৈধ জমি নিবন্ধন, ইজারা, ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা।
দাবি পূরণ না হলে হাইকোর্টে রিটের ঘোষণা
নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে দাবি অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশদাতার প্রত্যাশা, আইনগত ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
উন্নয়ন, অধিকার ও শান্তির সমন্বিত রূপরেখা
পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অধিকার, পরিবেশ, ভূমির নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগের নিশ্চয়তা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
পরিকল্পিত শিল্পায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন এবং স্বচ্ছ ভূমি ব্যবস্থাপনা এই অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়নের সুফল যেন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় এবং কোনো জনগোষ্ঠী ভূমি হারানো বা বৈষম্যের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের নৈকট্য পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও স্থিতিশীলতায় রূপান্তর করতে আইনি সংস্কার, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ এবং অধিকারভিত্তিক উন্নয়ননীতির সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।