ভারতে প্রায় ছয় দশকব্যাপী চলা বামপন্থী চরমপন্থা মাওবাদী বিদ্রোহের অন্তিম পর্ব

ভারতে প্রায় ছয় দশকব্যাপী চলা বামপন্থী চরমপন্থা মাওবাদী বিদ্রোহের অন্তিম পর্ব

ভারতে প্রায় ছয় দশকব্যাপী চলা বামপন্থী চরমপন্থা মাওবাদী বিদ্রোহের অন্তিম পর্ব
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

ভারতে প্রায় ছয় দশকব্যাপী বামপন্থী চরমপন্থা—যা সাধারণভাবে মাওবাদী বিদ্রোহ বা নকশাল আন্দোলন নামে পরিচিত—এখন কার্যত তার শেষ অধ্যায়ে উপনীত হয়েছে। এই আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামে, যেখানে কৃষক বিদ্রোহ ও শ্রেণিসংগ্রামের নামে একটি সশস্ত্র বিপ্লবী রাজনীতির জন্ম হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন কেবল পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ভারতের বিস্তীর্ণ আদিবাসী ও বনাঞ্চল অধ্যুষিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওবাদী) বা সিপিআই (মাওবাদী) ভারতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ২০১১ সালে তাদের প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়—যখন প্রায় ২২৩টি জেলা এই বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের মধ্যে পড়ে। এই সময়কালে অভূতপূর্ব সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অবকাঠামো ধ্বংস এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা বহু রাজ্যে উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থাকে কার্যত পঙ্গু করে দেয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাওবাদী বিদ্রোহ ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং তা এখন মূলত ছত্তিশগড়, ওডিশা, ঝাড়খণ্ড ও তেলেঙ্গানার মাত্র ছয়টি জেলায় সীমাবদ্ধ। বিদ্রোহী সংগঠনের নেতৃত্ব ও সামরিক কাঠামোয় একের পর এক বড় ধাক্কা তাদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে।

২০২৫ সালের ২১ মে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও শীর্ষ নেতা নাম্বালা কেশব রাও (বাসবরাজু) নিহত হন। একই বছরের ১৮ নভেম্বর নিহত হন মাওবাদীদের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মাদভি হিদমা। পাশাপাশি, সংগঠনের পলিটব্যুরো সদস্য ও প্রধান মতাদর্শিক চিন্তাবিদ ভেনুগোপাল রাও (সোনু)-এর আত্মসমর্পণ এই ইঙ্গিতই দেয় যে মাওবাদী বিদ্রোহীরা এখন মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ।

ঐতিহাসিকভাবে ছত্তিশগড়ের বাস্তার অঞ্চল ছিল মাওবাদীদের শেষ বড় শক্ত ঘাঁটি। তবে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রশাসনিক উপস্থিতি বৃদ্ধির ফলে এই অঞ্চলটিও ধীরে ধীরে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যে ৩১ মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে দেশটির দীর্ঘতম সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা এখন আর অবাস্তব মনে হচ্ছে না।

বিদ্রোহের দীর্ঘায়নের কারণ ও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া

এই প্রেক্ষাপটে মাওবাদী বিদ্রোহের বহুমাত্রিক গতিবিধি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। প্রশ্ন উঠে আসে—কীভাবে এবং কোন উপাদানগুলো এই বিদ্রোহকে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রেখেছিল? এর মতাদর্শিক আকর্ষণ কোথায় ছিল? নেতৃত্ব ও ক্যাডার কাঠামো কীভাবে গড়ে উঠেছিল? এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারসমূহ কীভাবে এই বিদ্রোহ মোকাবিলা করেছে?

এই বিদ্রোহ কেবল একটি নিরাপত্তা সমস্যা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবহেলার ফল। আদিবাসী অধ্যুষিত ‘রেড করিডর’ অঞ্চলে উন্নয়ন ও সংঘাতের দ্বন্দ্ব গত ছয় দশক ধরে একে অপরকে পুষ্ট করেছে। মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। গণতান্ত্রিক শাসনে অংশগ্রহণ ও ন্যায্য প্রাপ্তির বিঘ্ন থেকেই উত্থান ঘটে মাওবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহের।

সংঘাতোত্তর চ্যালেঞ্জ: উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তি

বিদ্রোহ দমনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংঘাতোত্তর বাস্তবতা মোকাবিলা। দীর্ঘদিনের সহিংসতায় বিধ্বস্ত এই অঞ্চলে এখনো—চরম দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মৌলিক যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাব, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট প্রকটভাবে বিদ্যমান।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

এ অবস্থায়, বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই চলবে না। প্রয়োজন—দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ও শাসন ঘাটতি পূরণ, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা, আত্মসমর্পণকারী বিপুল সংখ্যক সাবেক বিদ্রোহীর জন্য ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার, এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসভিত্তিক শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।

ভারতের মাওবাদী বিদ্রোহ ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছালেও,এর উত্তরাধিকার বকংবা রেশ এখনো জীবিত। এই সংঘাতের অবসান তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্র কেবল অস্ত্র নয়—উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার রাজনীতি দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষত সারাতে সক্ষম হবে। নতুবা, ইতিহাস নতুন রূপে পুরনো সংকটকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের সর্বত্রই সশস্ত্র সংঘাত নিরসনের পরীক্ষিত পথ হলো অন্তর্ভুক্তি, সাম্য, ন্যায্যতা, বৈষম্যমুক্তি ও মর্যাদাসম্পন্ন মানবিক অধিকারের নিশ্চয়তা।

– বার্তা ২৪।

You may have missed