শ্রদ্ধাঞ্জলি: শহীদ লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম

শ্রদ্ধাঞ্জলি: শহীদ লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম

শ্রদ্ধাঞ্জলি: শহীদ লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে যাঁরা প্রথম রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার পথ রচনা করেছিলেন, শহীদ লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাঁদের অগ্রপথিক। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে সংঘটিত সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হওয়া প্রথম বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা—একজন অকুতোভয় সৈনিক, যিনি মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।

১৯৪৭ সালের ৫ মে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন। তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) অধ্যয়নরত অবস্থায় দেশসেবার তাগিদে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্রথম বদলি পান ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে—যা ‘সিনিয়র টাইগারস’ নামে সুপরিচিত।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যশোর সেনানিবাসে অবস্থানরত ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে শীতকালীন প্রশিক্ষণের অজুহাতে সেনানিবাসের বাইরে পাঠানো হয়। একইসঙ্গে ইউনিটের রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, যাতে ২৫ মার্চের ভয়াল গণহত্যার খবর বাঙালি সৈনিকরা জানতে না পারেন।

৩০ মার্চ ১৯৭১, সকালে ব্রিগেড কমান্ডারের নির্দেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার দখলের চেষ্টা চালায়। সেই মুহূর্তে বাঙালি সৈনিকরা আত্মসমর্পণ নয়, প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। ক্যাপ্টেন হাফিজ ও লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন বিদ্রোহী সৈনিকদের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধের ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিককার এক অসম কিন্তু গৌরবোজ্জ্বল যুদ্ধ।

প্রায় সাত ঘণ্টাব্যাপী টানা সংঘর্ষের পর গোলাবারুদ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেলে বাঙালি সৈনিকরা কৌশলগতভাবে অবস্থান পরিবর্তন করে চৌগাছার দিকে সরে যেতে থাকেন। এই অসম লড়াইয়ের একপর্যায়ে শত্রুপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন গুরুতর আহত হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বীরোচিতভাবে শহীদ হন—স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের আগেই জীবন দিয়ে আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন।

সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ নিয়ে যশোরের হয়বতপুর গ্রামে পৌঁছান এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায় নজরুল ইসলাম কলেজের সামনে তাঁকে সমাহিত করেন। সেই মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এক সাহসী বাঙালি অফিসার, যাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল স্বাধীনতার প্রথম প্রতিরোধ।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র তাঁর বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। ঢাকার সেনানিবাসে প্রতিষ্ঠিত শহীদ বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট আনোয়ার গার্লস কলেজ আজও তাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

উল্লেখ্য, সেই ঐতিহাসিক প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় ৪০ জন বাঙালি সৈনিক শহীদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগই পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করে।

শহীদ লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন কেবল একজন সেনা কর্মকর্তা নন—তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রতিরোধের প্রতীক, সাহস ও আত্মত্যাগের অনন্ত অনুপ্রেরণা।

বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন—আপনাকে জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *