কাশ্মিরে মসজিদে পুলিশি নজরদারি, মুসল্লিদের মনে উদ্বেগ ও প্রশ্ন
![]()
নিউজ ডেস্ক
শ্রীনগরের হাড়কাঁপানো এক জানুয়ারির দুপুর। জোহরের নামাজ শেষ হওয়ার অনেকক্ষণ পরও মসজিদের ভেতরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন ৬৫ বছর বয়সী আবদুল রশিদ। দীর্ঘ জীবনে এই শহরে অনেক কিছু দেখেছেন তিনি, ক্র্যাকডাউন, কারফিউ, বন্দুকযুদ্ধ আর মাঝে-মধ্যে আসা ক্ষণস্থায়ী শান্তি। কিন্তু সেদিন তার হাতে থাকা কয়েক পাতার একটি ফরম তাকে এমনভাবে বিচলিত করে তুললো, যা আগে কখনও হয়নি।
স্থানীয় পুলিশ মসজিদের ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে এই ফরমটি পাঠিয়েছে। শুরুতে মসজিদের ধরন, নির্মাণের বছর কিংবা আয়ের উৎসের মতো সাধারণ কিছু প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এরপরই এমন কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে, যা দেখে রশিদ স্তব্ধ হয়ে যান। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের আধার নম্বর, তাদের ব্যবহৃত মোবাইলের আইএমইআই নম্বর এবং তাদের পরিবারের ব্যক্তিগত সব তথ্য।
রশিদ বলেন, সারা জীবন এই মসজিদে নামাজ পড়েছি। সংঘাতের চরম দিনগুলোতেও কেউ কখনও আমাদের কাছে এসব জানতে চায়নি।
ভারত-শাসিত কাশ্মিরে সম্প্রতি পুলিশ মসজিদ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল প্রশাসনিক কোনও সমীক্ষা নয়, বরং তাদের পবিত্রতম স্থানে রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।
পুলিশের এই প্রশ্নমালায় মসজিদের মাজহাব (বারেলভি, দেওবন্দি, হানাফি বা আহলে-হাদিস), জমির মালিকানা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের খুঁটিনাটি জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ছড়িয়েছে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং মসজিদ কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে। তাদের আধার নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের তথ্যও চাওয়া হচ্ছে।
২০১৯ সালের আগস্টে জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা (অনুচ্ছেদ ৩৭০) বাতিলের পর থেকে এই অঞ্চলের পুলিশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি দিল্লির হাতে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার নিযুক্ত লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহা এই অঞ্চল শাসন করছেন। স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনও ক্ষমতা নেই।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, কাশ্মির উপত্যকার ৯৭ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম। এখানে মসজিদ কেবল উপাসনালয় নয়, বরং শিক্ষা, সেবা এবং সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। সমালোচকদের মতে, স্থানীয় জবাবদিহিহীন এই শাসনব্যবস্থায় মসজিদের ওপর এমন নজরদারি ধর্মীয় স্বাধীনতায় বড় ধরনের আঘাত।
ইসলামি সংগঠনগুলোর জোট মুত্তাহিদা মজলিস-ই-উলামা (এমএমইউ) এই পদক্ষেপকে ‘নজিরবিহীন এবং আক্রমণাত্মক’ বলে অভিহিত করেছে। মিরওয়াইজ উমর ফারুকের নেতৃত্বাধীন এই জোটটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এটি ভারতীয় সংবিধানে দেওয়া গোপনীয়তার অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থি।
ন্যাশনাল কনফারেন্সের এমপি আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ বলেন, যখন একজন ইমাম জানবেন যে তার প্রোফাইল তৈরি করা হচ্ছে, তখন তার খুতবা বা বয়ান বদলে যাবে। এটা আইনের কারণে নয়, বরং ভয়ের কারণে হবে।
একই সুরে কথা বলেছেন সিপিআই নেতা মোহাম্মদ ইউসুফ তারিগামি এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। মেহবুবা মুফতি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, যদি নিরাপত্তার খাতিরেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রোফাইলিং প্রয়োজন হয়, তবে কেবল মসজিদগুলোকেই কেন লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে?
এমনকি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন, এই সমীক্ষায় মন্দির, গুরুদুয়ারা বা গির্জার চেয়ে মসজিদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কাশ্মিরিরা দীর্ঘকাল ধরেই নজরদারির মধ্যে বসবাস করছেন। কিন্তু এবারের বিষয়টি ভিন্ন। শ্রীনগরের একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বলেন, এটি বর্তমানের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণের জন্য নথিপত্র তৈরি করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কাশ্মিরের একজন ইমাম তার উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, জুমার নামাজের আগে এখন প্রতিটি শব্দ নিয়ে দুবার ভাবতে হয়। আমাদের ধর্ম সত্য কথা বলতে শেখায়, কিন্তু যখন জানি আমার ফোন নম্বর আর আধার নম্বর নথিবদ্ধ আছে, তখন নীরব থাকাই নিরাপদ মনে হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
বারামুল্লার এক মসজিদ কমিটির সদস্য জানান, বিনা বেতনে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীরা এখন আতঙ্কিত। তারা ভয় পাচ্ছেন, এতে তাদের পাসপোর্ট পাওয়া বা সরকারি চাকরিতে কোনও সমস্যা হবে কিনা।
আরেকজন ধর্মীয় নেতার কথায় পুরো পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে ওঠে। তিনি বলেছেন, তারা আমাদের মসজিদ বন্ধ করেনি, তারা আমাদের মনের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে।
আবদুল রশিদের মতো বয়োজ্যেষ্ঠ মুসল্লিদের ভয় আরও গভীর। তিনি আশঙ্কা করছেন, ঝামেলার ভয়ে তরুণরা নামাজ পড়ানো বা মসজিদের দায়িত্ব নেওয়া থেকে পিছিয়ে আসবে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, একবার মসজিদের ভেতরে ভয় ঢুকে পড়লে আমরা কেবল গোপনীয়তাই হারাবো না, আমরা আমাদের সম্প্রদায়ের হৃদয়টাকেই হারিয়ে ফেলবো।
টিআরটি অবলম্বনে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।