নতুন সংসদ গঠনের কয়েক সপ্তাহ আগে ‘গণতন্ত্রের’ মোড়কে নজরদারি জোরদার করল মিয়ানমার জান্তা
![]()
নিউজ ডেস্ক
নতুন সংসদ গঠনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নাগরিকের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন সংশোধন করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। প্রথম দৃষ্টিতে এই সংশোধনীতে গণতান্ত্রিক সুরক্ষা ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত থাকলেও, আইনে যুক্ত বিস্তৃত ‘ব্যতিক্রমী ধারা’ কার্যত নিরাপত্তা বাহিনীকে আগের মতোই সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
২০১৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারের আমলে প্রণীত ‘ল’ প্রোটেক্টিং দ্য প্রাইভেসি অ্যান্ড সিকিউরিটি অব সিটিজেন্স’ আইনটি নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতার ওপর স্পষ্ট সীমা আরোপ করেছিল। ওই আইনে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আদালতের পরোয়ানা বাধ্যতামূলক করা হয়, গৃহে বিনা পরোয়ানায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং গ্রেপ্তারের কারণ আটক ব্যক্তিকে জানানো বাধ্যতামূলক ছিল।
তবে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সামরিক সরকার ওই আইনের মূল ধারাগুলো স্থগিত করে। এর ফলে পরোয়ানা ছাড়াই বাড়িঘরে প্রবেশ, তল্লাশি, আলামত জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পায় নিরাপত্তা বাহিনী। একই সঙ্গে আদালতের অনুমতি ছাড়াই ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় সন্দেহভাজনদের আটক রাখা এবং নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নজরদারির সুযোগ তৈরি হয়।
আইন স্থগিতের ফলে ব্যক্তিগত বার্তা নজরদারি, টেলিকম অপারেটরদের কাছ থেকে ফোন ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগের তথ্য দাবি এবং আদালতের অনুমোদন ছাড়াই সম্পত্তি জব্দ ও ধ্বংসের পথও উন্মুক্ত হয়। গত বছরের আগস্টে এই স্থগিতাদেশ পুনর্বহাল করে জান্তা, যা অনেকের মতে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পরিকল্পিত নির্বাচনের আগে ভিন্নমত দমনের কৌশল। ওই নির্বাচনকে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশ ও মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলন ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
৩ ফেব্রুয়ারি জারি করা নতুন সংশোধনীতে আইনের মাত্র দুটি অনুচ্ছেদ বদলানো হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এনএলডি সরকারের সময় অনুচ্ছেদ ৫(খ)-এ কোনো বাড়িতে গ্রেপ্তার অভিযানের সময় অন্তত দুইজন সাক্ষী—যেমন ওয়ার্ড বা ১০-ঘর প্রশাসকের উপস্থিতি—বাধ্যতামূলক ছিল। জান্তা সেখানে যুক্ত করেছে, ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা’র কথা উল্লেখ করলে সাক্ষী ছাড়াই প্রবেশ করা যাবে। ফলে শর্তটি কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
একই ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে অনুচ্ছেদ ৮-এ। আগে যেখানে পরোয়ানা বা আইনি অনুমোদন ছাড়া বাড়িতে প্রবেশ বা গ্রেপ্তার নিষিদ্ধ ছিল, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে একই সর্বব্যাপী ব্যতিক্রম। বিশ্লেষকদের মতে, এতে পরোয়ানা ব্যবস্থাটি নামমাত্র রয়ে গেছে।
সংশোধনীতে অনুচ্ছেদ ৭-এর উল্লেখ না থাকায় সেটি এখনও স্থগিতই আছে। ফলে আদালতের অনুমোদন ছাড়াই ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আটক রাখার ক্ষমতা বহাল থাকছে। একইভাবে অনুচ্ছেদ ৮-এর উপধারাগুলোও স্থগিত থাকায় ব্যক্তিগত যোগাযোগে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা অব্যাহত রয়েছে।
ডিজিটাল অধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মিয়ানমার ইন্টারনেট প্রজেক্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এর মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আরও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।” সংস্থাটির ডিজিটাল অধিকার বিশ্লেষক কো থিত ন্যান বলেন, “নতুন সরকার গঠনের আগে দেশীয় প্রতিরোধ নেটওয়ার্ককে আরও আক্রমণাত্মকভাবে টার্গেট করাই এর লক্ষ্য। তারা সব দিক থেকে প্রতিটি ফাঁক বন্ধ করছে।”
অভ্যুত্থানের পর ২০১২ সালের ওয়ার্ড বা ভিলেজ ট্র্যাক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আইনও পুনর্বহাল করে জান্তা, যেখানে রাতযাপনের অতিথিদের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক। এই দুই আইন ব্যবহার করে ‘রাতের অতিথি তল্লাশি’র অজুহাতে বাড়ি ভাঙচুর, অফিসে অভিযান ও গণতন্ত্রপন্থিদের আটক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তাকারী সংগঠন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর মধ্যে বুধবার পর্যন্ত ২২ হাজার ৭৯৩ জন এখনও আটক রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, আইন সংশোধনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো, যখন সামরিক সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে দেশ-বিদেশে তীব্র প্রশ্ন ও সমালোচনা চলছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।