কম্বোডিয়ার অনলাইন জালিয়াতি কারখানায় অভিযান: আটক ১৭৯ মিয়ানমার নাগরিক
![]()
নিউজ ডেস্ক
কম্বোডিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় স্বায় রিয়েং প্রদেশের সীমান্ত শহর বাভেটে একটি অনলাইন জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে দুই হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে অন্তত ১৭৯ জন মিয়ানমারের নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছে ক্যাম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
৩১ জানুয়ারি পরিচালিত এই অভিযানে আটক বিদেশিদের মধ্যে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে ১ হাজার ৭৯২ জন, তাইওয়ান থেকে পাঁচজন, ভিয়েতনাম থেকে ১৭৭ জন এবং মিয়ানমার থেকে ১৭৯ জন রয়েছেন। অভিযানের শিকার ওই কম্পাউন্ডটি মানবপাচার ও অনলাইন প্রতারণার জন্য কুখ্যাত এবং কম্বোডিয়ার অন্যতম বৃহৎ স্ক্যাম হাব হিসেবে পরিচিত।
কম্পাউন্ডে আটকে পড়া এক মিয়ানমার নাগরিক ‘দ্য ইরাবতী’কে জানান, বাভেট এলাকার স্ক্যাম কম্পাউন্ডগুলো কম্বোডিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ। তার ভাষায়, অনেক ভুক্তভোগীকে একাধিকবার বিক্রি করার পর সেখানে আনা হয়। তিনি বলেন, শ্রমিকদের ভবনের ভেতরে তালাবদ্ধ রাখা হতো, দিনে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো, বেতন দেওয়া হতো না এবং মারধরের শিকার হতে হতো। প্রতিটি ভবন নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে ঘেরা ছিল এবং বৈদ্যুতিক বেড়া থাকায় পালানো কার্যত অসম্ভব ছিল।
মানবপাচারের শিকার এক মিয়ানমার নারী জানান, তারা বারবার মিয়ানমার দূতাবাস ও অভিবাসী সহায়তা সংস্থার কাছে সাহায্য চাইলেও কোনো সহায়তা পাননি। অবশেষে কম্বোডিয়া কর্তৃপক্ষ অভিযান চালালে কেউ পালানোর চেষ্টা না করে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি বলেন, সকাল আটটার দিকে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য ভবন ঘিরে ফেলে এক কক্ষ এক কক্ষ করে অভিযান চালান।
২৭ বছর বয়সী ওই নারী জানান, তিনি আগে থাই সীমান্তবর্তী মিয়াওয়াডিতে একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালাতেন। পরে জান্তার অভিযানের পর মান্দালয়ে চলে যান। সেখান থেকে এক দালালের প্রলোভনে মাসিক ৪০ লাখ কিয়াত বেতনের চীনা দোভাষীর চাকরির আশ্বাস পেয়ে ২১ ডিসেম্বর থাইল্যান্ড হয়ে কম্বোডিয়ায় যান। সেখানে পৌঁছানোর পর দালালের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে পাঠানো হয়।
কম্পিউটার দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে জাপানি নাগরিকদের লক্ষ্য করে অনলাইন প্রতারণার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ১০ হাজার মার্কিন ডলার ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো। তিনি বলেন, সেখানে কোনো ছুটি ছিল না, সারাদিন কাজ করতে হতো, ঘুমানোর সময়ও মিলত না এবং বাসস্থানের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নাজুক।
অভিযানের পর আটক হওয়ার পর তিনি ও অন্যরা মিয়ানমার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। দূতাবাস তাদের জানায়, তাদের নাম ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং প্রত্যাবাসনে দুই সপ্তাহ থেকে এক মাস সময় লাগতে পারে। তার দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় এক হাজার মিয়ানমার নাগরিক প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে ‘দ্য ইরাবতী’ ফনম পেনের মিয়ানমার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে দেশে ফেরার বিষয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ সম্প্রতি ইয়াঙ্গুনে ফেরত পাঠানো এক ব্যক্তিকে জান্তা কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার জান্তার চালানো স্ক্যামবিরোধী অভিযানের ফলে মিয়াওয়াডি এলাকার বহু জালিয়াতি চক্র কম্বোডিয়ায় স্থানান্তরিত হয়, যা নতুন করে মানবপাচারের ঢেউ সৃষ্টি করেছে। ‘দ্য ইরাবতী’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাঁচজন মিয়ানমার নাগরিক জানান, তারা গত বছর কম্বোডিয়ায় যান। এর মধ্যে একজন ৬ হাজার ৫০০ ডলার দিয়ে মুক্তি কিনে দেশে ফিরেছেন, আরেকজন থাই-কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘর্ষের সময় পালিয়ে নিজ উদ্যোগে দেশে ফেরেন।
অন্য তিনজন নারী এখনও কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে দুজন জানুয়ারির শুরুর দিকে অভিযানের সময় পালিয়ে গিয়ে অন্য কাজ খুঁজছেন। সাগাইং অঞ্চলের ওয়েটলেট উপজেলার এক ২০ বছর বয়সী নারী জানান, দূতাবাসে যোগাযোগ করলে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে—এই আশঙ্কায় তারা তা করছেন না। জীবিকা হারিয়ে তারা বাড়ি বন্ধক রেখে বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাড় করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
কম্বোডিয়ীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটক মিয়ানমার নাগরিকদের দূতাবাসে হস্তান্তর করা হচ্ছে। দেশটির অভিবাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে তিন দফায় ৭২৯ জন মিয়ানমার নাগরিককে দূতাবাসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে নিবন্ধন করেও কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হননি।
প্রসঙ্গত, টানা পাঁচ বছরের সামরিক শাসনে মিয়ানমারের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান সংকট ও বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের চাপে অসংখ্য মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এই সুযোগে দালালচক্র সহজ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনেককেই বিদেশে মানবপাচারের ফাঁদে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।