মিয়ানমারে ৫৪.২২% ভোট পড়েছে দাবি মিন অং হ্লাইংয়ের, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

মিয়ানমারে ৫৪.২২% ভোট পড়েছে দাবি মিন অং হ্লাইংয়ের, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

মিয়ানমারে ৫৪.২২% ভোট পড়েছে দাবি মিন অং হ্লাইংয়ের, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং তার সরকারের বহুল সমালোচিত নির্বাচনকে ‘সফল’ বলে দাবি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনে ৫৪ দশমিক ২২ শতাংশ ভোটার অংশ নিয়েছেন—যা তার ভাষ্যমতে সাম্প্রতিক সময়ে বহু গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনের তুলনায় বেশি।

সোমবার নেপিদোতে ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশনের (ইউইসি) চেয়ারম্যান ও বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।

জান্তা প্রধান দাবি করেন, ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ১ কোটি ৩১ লাখ ৪০ হাজার ভোটার ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন তিন দফায়—২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের ১১ ও ২৫ জানুয়ারি—দেশের ২৬৩টি টাউনশিপে অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৫ সালে অন্তত ৫০টি দেশে ভোটার উপস্থিতি ৫৪ শতাংশের নিচে ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্রান্স, আলজেরিয়া, বুলগেরিয়া, মিসর, ক্রোয়েশিয়া, জ্যামাইকা ও জাপানের নাম উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, “সুতরাং আমরা বলতে পারি আমাদের নির্বাচন একটি সফল নির্বাচন।”

তবে নির্বাচন বিশ্লেষকরা এ দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক বিশ্লেষক বলেন, “যখন কেবল নিরাপদ কিছু এলাকায় ভোট হয়েছে, তখন উপস্থিতির এই সংখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়।” তার মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বহু এলাকায় ভোট বাতিল হওয়ায় মোট যোগ্য ভোটারের সংখ্যা কমে গেছে, ফলে শতাংশ হিসাব কৃত্রিমভাবে বেড়েছে।

মিন অং হ্লাইং জাপানের নির্বাচনের উদাহরণ দিলেও জাপানি সংবাদমাধ্যম নিপ্পনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে সর্বশেষ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৬ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা আগের বছরের ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। একইভাবে থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ বলে জানিয়েছে ব্যাংকক পোস্ট।

অন্যদিকে, জান্তার আয়োজিত নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল মিয়ানমারের প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
২০২০ সালে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭০ শতাংশ—৩ কোটি ৭০ লাখ যোগ্য ভোটারের মধ্যে ২ কোটি ৫৯ লাখ ভোট দেন, আন্তর্জাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা ফাউন্ডেশন (আইএফইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী।
২০১৫ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
এমনকি সাবেক সামরিক শাসক সিনিয়র জেনারেল থান শ্বের আমলে ২০১০ সালের নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ শতাংশ।

মিন অং হ্লাইং দাবি করেন, ‘সুশৃঙ্খলভাবে’ ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়া জনগণের সমর্থনের প্রতিফলন এবং জান্তার রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রতি জনসমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে।

তবে নির্বাচনকে দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রহসন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইউ উইন মিন্ত ও স্টেট কাউন্সেলর দাও অং সান সু চি কারাগারে রয়েছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় দল এনএলডিসহ একাধিক বিরোধী দল বিলুপ্ত করা হয়েছে।

অনেক নাগরিক ভোট বর্জন করেন। এমনকি বৈঠকে মিন অং হ্লাইং স্বীকার করেন, “ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির” কারণে কিছু মানুষ ভোট দেননি। বিভিন্ন টাউনশিপে তিন দফা ভোটেই অত্যন্ত কম উপস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। অংশ নেওয়া অনেকেই অভিযোগ করেন, জান্তার ভয়ভীতি ও চাপের মুখে তারা ভোট দিয়েছেন।

জান্তা প্রধান জানান, ৫৭টি অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে ৩১টি দলের প্রার্থী এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিভিন্ন কক্ষে নির্বাচিত হয়েছেন।

ইউইসি ঘোষিত ফল অনুযায়ী, সংসদের সব কক্ষে মোট ১ হাজার ২৫টি আসনের মধ্যে ৭৩৯টি বা ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ আসন পেয়েছে সামরিক সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। ফলাফলটি অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল না, কারণ নির্বাচনকে আগেই প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছিল।

ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি (এনইউপি) ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ আসন নিয়ে দ্বিতীয় এবং শান ও ন্যাশনালিটিজ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (এসএনডিপি) ৩ দশমিক ৮ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

৮৮ প্রজন্মের ছাত্রনেতা উ কো কো গির নেতৃত্বাধীন পিপলস পার্টি (পিপি) পেয়েছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ আসন এবং ডা. থেট থেট খাইনের নেতৃত্বাধীন পিপলস পাইওনিয়ার পার্টি (পিপিপি) পেয়েছে ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ আসন।

তবে ইউএসডিপি ছাড়া অন্য কোনো দলের শীর্ষ নেতা নিজ নিজ আসনে জয়ী হতে পারেননি। পরাজিতদের মধ্যে রয়েছেন পিপির উ কো কো গি, এসএনডিপির সাই আইক পাও, আরাকান ফ্রন্ট পার্টির ডা. আয়ে মাউং, ফেডারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির দাও চো চো কিয়াও ন্যেইন এবং মিয়ানমার ফার্মার্স ডেভেলপমেন্ট পার্টির কিয়াও সোয়ার সোয়ে।

কয়েকটি দল ইউএসডিপির বিরুদ্ধে অগ্রিম ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুললেও নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, সব প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে।

গত ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি জান্তা উভয় কক্ষে বসার জন্য ১৬৬ জন সামরিক প্রতিনিধির নাম প্রকাশ করে। ২০০৮ সালের সামরিক প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে সেনাবাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রয়েছে।

চলমান সংঘাতের কারণে বহু এলাকায় ভোট সম্ভব না হওয়ায় মাত্র ৪২০ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য নতুন পার্লামেন্টে যোগ দিচ্ছেন। এর সঙ্গে ১৬৬ জন সামরিক মনোনীত সদস্য যুক্ত হলে মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮৬ জনে। ফলে সেনাবাহিনীর ১৬৬ আসন কার্যত নতুন সংসদের প্রায় ২৮ শতাংশে পরিণত হয়েছে।

সামরিক সদস্য ও ইউএসডিপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে জান্তা প্রধানের রাষ্ট্রপতি হওয়ায় কার্যত কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই।

জাতিসংঘ, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জান্তা-আয়োজিত এ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নয় বলে নিন্দা জানিয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed