২০২৫ মিয়ানমারের শিশুদের জন্য সবচেয়ে রক্তাক্ত বছর, ৩২২০ বেসামরিক নিহত- জাতিসংঘ
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সাল শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা। উন্মুক্ত সূত্র ও স্বাধীন পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীগুলোর তথ্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে জান্তার হাতে অন্তত ৩ হাজার ২২০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৯৪ জন শিশু ও ৮০০ জন নারী।
এদিকে জান্তার হত্যাকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) জানিয়েছে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭ হাজার ৮৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ১৬ জন শিশু ও ২ হাজার ৮৯ জন নারী রয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে এএপিপি যাচাই করে ১ হাজার ৫১৪ জন বেসামরিক নিহতের তথ্য নিশ্চিত করতে পেরেছে, যাদের মধ্যে ২৮৭ জন শিশু ও ৫০৮ জন নারী রয়েছেন।
ওএইচসিএইচআর বলেছে, ২০২৫ সালে বেসামরিক হতাহতের প্রধান কারণ ছিল জান্তার বিমান হামলা। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে বিমান হামলায় অন্তত ৬৪১ জন বেসামরিক নিহত হন। আর ২০২৫ সালে আকাশপথে হামলায় ৯৮২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৩২ জন শিশু ও ৩৬৮ জন নারী।
সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে শিশু নিহতের সংখ্যা ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিহত শিশুদের সম্মিলিত সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ১২ মে সাগাইং অঞ্চলের দেপাইয়িন টাউনশিপের ও হতেইন টুইন গ্রামে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) পরিচালিত একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ চলাকালে সামরিক যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। স্থলভাগে কোনো সংঘর্ষ না থাকা সত্ত্বেও চালানো ওই হামলায় ২২ জন শিক্ষার্থী ও দুই নারী শিক্ষক নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন। শিশুদের ক্ষেত্রে এটিকেই ২০২৫ সালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে ওএইচসিএইচআর।
একইভাবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকতাও টাউনশিপে, যা আরাকান আর্মি (এএ)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন, থায়াত তাবিন গ্রামে দুটি বেসরকারি বোর্ডিং স্কুলে জান্তার যুদ্ধবিমান দুটি ৫০০ পাউন্ডের বোমা নিক্ষেপ করে। এতে ১৫ থেকে ২১ বছর বয়সী ২০ জন শিক্ষার্থী নিহত এবং আরও ২২ জন আহত হন। শিশুদের জড়িত আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে এটি উল্লেখ করা হয়েছে।
ওএইচসিএইচআর জানায়, ২০২৫ সালের সবচেয়ে ভয়াবহ কয়েকটি ঘটনার জন্য যুদ্ধবিমান থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক গোলাবারুদ ব্যবহারের বিষয়টি দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি রাখাইন রাজ্যের আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত রামরি টাউনশিপের কিয়াউক নি মাও মুসলিম গ্রামে বিমান হামলা। ওই হামলায় ৪১ জন বেসামরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২ জন নারী ও সাতজন শিশু ছিলেন। আহত হন আরও ৫০ জনের বেশি।

২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে রাখাইন রাজ্যের আরাকান আর্মি পরিচালিত ম্রাউক-ইউ জেলা পাবলিক হাসপাতালে জান্তা বিমান হামলা চালায়। এতে ১৬ জন নারীসহ ৩৩ জন রোগী, সেবাদানকারী ও হাসপাতাল কর্মী নিহত হন এবং আহত হন ৭০ জনের বেশি। ২০২১ সালের পর থেকে মিয়ানমারে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে চালানো সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হিসেবে এটিকে আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা।
সংস্থাটি আরও জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ২০২৫ জুড়ে জান্তা হেলিকপ্টারের পরিবর্তে স্থির-পাখাবিশিষ্ট বিমানগুলোর পাশাপাশি প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার ব্যবহার বাড়িয়েছে, যার প্রভাব বেসামরিক জনগণের ওপর ছিল ভয়াবহ। এসব হামলায় বাড়িঘর, বাজার, মঠ, হাসপাতাল, স্কুল ও বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
সাগাইংসহ মধ্যাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলো এসব হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উন্মুক্ত সূত্রের বরাত দিয়ে ওএইচসিএইচআর জানায়, ২০২৫ সালে ৩০৯টি প্যারামোটর হামলায় ১৬৩ জন বেসামরিক নিহত এবং ৬৪টি জাইরোকপ্টার হামলায় ৩৪ জন নিহত হয়েছেন।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সাগাইং অঞ্চলের চাউং-ইউ টাউনশিপের বোন তো গ্রামে থাডিংইউত ধর্মীয় উৎসবে জড়ো হওয়া জনতার ওপর দুটি প্যারামোটর থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে অন্তত ২৩ জন বেসামরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে দুইজন নারী ও চারজন শিশু ছিলেন। আহত হন ৬০ জনের বেশি।
এদিকে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের মানবাধিকার মন্ত্রণালয়ের ডাটা ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মোট ৯ হাজার ৭৯৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে জান্তা। এসব হামলায় ১৫০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ৪৪৯টি স্কুল ও ৬৭৩টি ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে ৪ হাজার ৮৫৩ জন নিহত এবং অন্তত ৮ হাজার ৬৪২ জন আহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, মিয়ানমারজুড়ে বেসামরিক জনগণ নির্বিচারে গোলাবর্ষণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম, স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক সৈন্যভর্তি এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষিত হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্কুল, ধর্মীয় স্থাপনা ও বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রও ধারাবাহিকভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও দমন-পীড়ন পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে নারী ও শিশুদের।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।