মিয়ানমারে মোবাইল ডিভাইস নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, নজরদারি বাড়ানোর আশঙ্কা

মিয়ানমারে মোবাইল ডিভাইস নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, নজরদারি বাড়ানোর আশঙ্কা

মিয়ানমারে মোবাইল ডিভাইস নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, নজরদারি বাড়ানোর আশঙ্কা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা দেশজুড়ে একটি নতুন মোবাইল ডিভাইস নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করছে, যার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো এবং তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

মার্চের প্রথম সপ্তাহে জান্তা সরকার তথাকথিত সেন্ট্রাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (সিইআইআর) চালু করেছে। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় এখন থেকে শুধু সিম কার্ড নয়, বরং প্রতিটি মোবাইল ডিভাইসের স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধন না করলে ওই ডিভাইস মোবাইল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে পারবে না।

জান্তা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়েছে, যারা চলতি মাসের শেষের মধ্যে তাদের মোবাইল ফোন নিবন্ধন করবেন না, তারা প্রথমে ৩০ দিনের সীমিত ব্যবহার সুবিধা পাবেন। এরপর ওই ডিভাইস সম্পূর্ণভাবে ব্লক করে দেওয়া হবে।

ঘোষণা অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত যেসব মোবাইল ফোনে মিয়ানমারের সিম—এমপিটি, এটম, ওরিডু/ইউ৯ অথবা মাইটেল—ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো ৩১ মার্চের আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি “হোয়াইটলিস্ট”-এ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়সীমার পর নিবন্ধনবিহীন যেকোনো ডিভাইসকে নতুন হ্যান্ডসেট হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেগুলোর ওপর কর ও জরিমানা আরোপ করা হবে।

জান্তা কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো জনগণ যাতে “আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে” মানসম্মত এবং যথাযথভাবে কর পরিশোধ করা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারে তা নিশ্চিত করা।

তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো নজরদারি জোরদার করা এবং নিবন্ধনবিহীন ডিভাইস ব্যবহারে বাধা দেওয়া। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দা, কর্মী-অ্যাক্টিভিস্ট এবং প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যরা এমন ডিভাইস ব্যবহার করে থাকেন।

একজন আইটি বিশেষজ্ঞ দ্য ইরাবতীকে বলেন, “এই বিধিমালার একটি অংশ অবশ্যই কর আদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদেশ থেকে একটি ফোন কিনে এনে কর না দিয়ে মিয়ানমারে ব্যবহার করা যাবে না।”

তবে তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু করের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো ডিভাইসের আইএমইআই নম্বর কর্তৃপক্ষের কাছে থাকলে শুধু সিম কার্ড বদলালেই আর নিরাপদ থাকা যাবে না। কোনো ফোন যদি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হয়, তাহলে সিম ফেলে দিলেও সেই ফোনের সূত্র ধরা থাকবে—সেক্ষেত্রে পুরো ডিভাইসটাই ফেলে দিতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “লোকেশন সার্ভিস বন্ধ থাকলেও তারা বুঝতে পারবে কোন ডিভাইস ব্যবহার হচ্ছে এবং সেটি কোথায় রয়েছে। তারা যদি ডিভাইস ব্লক করে দেয়, তাহলে আর কিছুই করার থাকবে না। আগের তুলনায় এটি অনেক কঠোর ব্যবস্থা।”

আরেকজন আইটি বিশেষজ্ঞ জানান, এই ব্যবস্থার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে—চোরাই বা পাচার করা ফোন বন্ধ করা এবং প্রতিটি ডিভাইসকে নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর সঙ্গে যুক্ত করা।

তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত শুধু সিম কার্ডই একজন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত থাকে। কিন্তু সিইআইআর চালু হলে ফোনটিও সরাসরি ব্যবহারকারীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে।”

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এই নিবন্ধন ব্যবস্থার নাম কিছুটা বিভ্রান্তিকর। এটি বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত সিইআইআর প্রোটোকলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, যে ব্যবস্থার মাধ্যমে হারানো মোবাইল ফোন আন্তর্জাতিকভাবে ট্র্যাক করা যায়।

মিয়ানমারের এই “হোয়াইটলিস্ট” ব্যবস্থা, যেখানে কেবল অনুমোদিত ফোনই ব্যবহার করা যাবে, অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশের সিমভিত্তিক নিবন্ধন পদ্ধতির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক দেশে সব ফোনই ব্যবহার করা যায়, শুধু চুরি হওয়া ফোনের ক্ষেত্রে ব্লক করা হয়। বাধ্যতামূলক সিইআইআর ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের কথা উল্লেখ করা হয়।

মিয়ানমার ইন্টারনেট প্রজেক্টের ডিজিটাল অধিকার বিশ্লেষক থিত নিয়ান বলেন, প্রযুক্তি সম্প্রদায়ের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। কারণ সিম কার্ডের নিবন্ধনের সঙ্গে আইএমইআই নম্বর যুক্ত হলে কর্তৃপক্ষ সহজেই একজন ব্যবহারকারীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

তিনি বলেন, “তারা দেখতে পারবে একজন ব্যক্তি কোথায় আছেন, কতক্ষণ সেখানে থাকছেন এবং এরপর কোথায় যাচ্ছেন। সিম ও আইএমইআই একসঙ্গে যুক্ত থাকলে অপারেটররা এটাও জানতে পারবে কে কাকে কখন ফোন করেছে। চাইলে কর্তৃপক্ষ সেই কলও আড়িপেতে শুনতে পারবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ঠিক এমনই পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।”

জান্তা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম এই উদ্যোগকে পাচার হওয়া ফোনের ওপর কর আদায় এবং নিম্নমানের ডিভাইস ব্যবহারে বাধা দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা বলছেন, এর পেছনে বৃহত্তর একটি প্রবণতা স্পষ্ট।

থিত নিয়ান বলেন, “সব মিলিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে কঠোর করার একটি প্রক্রিয়া। তারা ফোন ব্লক করতে পারবে, সিম কার্ড ব্যবহারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। এটি জনগণের সুবিধার জন্য নয়, বরং শাসন সহজ করা এবং নজরদারি ও দমননীতি বাড়ানোর জন্য।”

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বারবার টেলিকম অপারেটর ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্যদের খুঁজে বের করা, গ্রেপ্তার করা এবং লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জান্তা সরকার চীনের সহায়তায় একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থার ব্যবহারও বাড়িয়েছে, যার মাধ্যমে চেকপোস্ট, হোটেল ও টিকিট কাউন্টারে জাতীয় নিবন্ধন নম্বরের সঙ্গে অপরাধের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা যায়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নতুন এই মোবাইল নিবন্ধন ব্যবস্থা, ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রকল্প এবং যোগাযোগে আড়িপাতা সক্ষমতা সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে মিয়ানমারে একটি পূর্ণাঙ্গ নজরদারি রাষ্ট্র গড়ে তোলার পথে আরেকটি বড় পদক্ষেপ।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।