বৈসাবিকে ঘিরে অপতৎপরতার আশঙ্কা: সশস্ত্র গোষ্ঠীর গুজব-সন্ত্রাস মোকাবেলায় সতর্ক পাহাড়
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে পাহাড়ের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবিকে সামনে রেখে নিরাপত্তা জোরদারে সমন্বয় সভা করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০৩ পদাতিক ব্রিগেড ও খাগড়াছড়ি রিজিয়ন। আজ রোববার (৫ এপ্রিল) দুপুরে রিজিয়নের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় উৎসবকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিশেষ করে পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপতৎপরতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম ওবায়দুল হক।
শুরুতেই বৈসাবিকে ঘিরে পুরো জেলায় আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করা হয়। একইসঙ্গে বিগত কয়েক বছরে বৈসাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনার দিকও তুলে ধরা হয়, যেখানে উৎসবের পরিবেশ নষ্ট করার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।

সভায় জানানো হয়, অতীতের মতো এবারও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকরা বৈসাবির আনন্দকে বিঘ্নিত করতে নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাতে পারে। এ ধরনের অপতৎপরতা প্রতিহত করতে স্থানীয় সামাজিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক নেতৃবৃন্দের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন উপস্থিত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। উৎসব চলাকালে পাড়া-মহল্লার মেলা ও আয়োজনগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার পাশাপাশি সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান রিজিয়ন কমান্ডার।
সভায় রিজিয়নের স্টাফ অফিসার মেজর কাজী মোস্তফা আরেফিন আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর কৌশল ও তৎপরতা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র কোনো ঘটনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘রং মাখিয়ে’ সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা দীর্ঘদিনের একটি কৌশল। কথিত অধিকার আদায়ের নামে আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিজেরাই ছোটখাটো ঘটনা সৃষ্টি করে, পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে বড় ধরনের দাঙ্গা বা অস্থিতিশীলতায় রূপ দিতে চায়। আসন্ন বৈসাবিকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে সক্রিয় কিছু সাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনও এ ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে এসব সংগঠন তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে, যা উৎসবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে বলেও জানান তিনি।
বিশেষ করে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন উপজাতিভিত্তিক আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ-এর মতো অন্যান্য আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর নাম উল্লেখ করে মেজর মোস্তফা বলেন, এসব সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
গত বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটিও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পুরনো কৌশলের অংশ। এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে, যাতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে নতুন বছরের প্রাক্কালে সাজেক ভ্যালি-সহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম হবে—এ বিষয়টি মাথায় রেখে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও করণীয় নিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

এছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সংকটকে ইস্যু করে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়। বৈসাবি চলাকালে অস্থায়ী তাবু ও মেলার স্টলে অগ্নিকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম ওবায়দুল হক বলেন, বৈসাবি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রাণের উৎসব এবং এই উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না।
তিনি বলেন, “এত সুন্দর একটি আয়োজনকে কেউ নস্যাৎ করার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করতে নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।” সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি সাম্প্রদায়িক ঘটনার উল্লেখ করে তিনি সেসব থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি সদর জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল খাদেমুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মোঃ মোরতজা আলী খান, রিজিয়নের স্টাফ অফিসারসহ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস, সাংবাদিক, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এবং বৈসাবি উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিরা।
সমন্বয় সভায় বক্তারা মনে করেন, আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপতৎপরতা মোকাবেলায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে বৈসাবি উৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, ‘বৈসাবি’ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব, যা ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু—এই তিন উৎসবের সমন্বয়ে গঠিত। বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নববর্ষের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১২-১৪ এপ্রিল (ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্জ্যাপজ্জা) নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন ও শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে এই উৎসব উদযাপিত হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।