‘বেসামরিক রূপে’ নতুন সরকার: ৩১ মন্ত্রণালয় গঠন, ৩০ মন্ত্রী মনোনয়ন মিন অং হ্লাইংয়ের
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান নেতা মিন অং হ্লাইং—যিনি গত ৩ এপ্রিল জান্তা-নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়ন পার্লামেন্টে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন—তার তথাকথিত বেসামরিক সরকারের জন্য ৩১টি মন্ত্রণালয় গঠন করেছেন এবং সেগুলোর নেতৃত্বে ৩০ জন মন্ত্রীর নাম প্রস্তাব করেছেন। এদের মধ্যে প্রায় ২০ জনই সামরিক পটভূমির ব্যক্তি এবং ১৬ জন বর্তমান জান্তা সরকারের মন্ত্রী।
মঙ্গলবার তিনি জান্তা-প্রভাবিত ইউনিয়ন পার্লামেন্টে মন্ত্রীদের নামের তালিকা জমা দেন, যেখানে সামরিক প্রতিনিধিদের পাশাপাশি জান্তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল Union Solidarity and Development Party (ইউএসডিপি) সংখ্যাগরিষ্ঠ।
প্রস্তাবিত তালিকায় বর্তমান বিমানবাহিনী প্রধান জেনারেল হতুন অংকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ইয়াঙ্গুন আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডের প্রধান ও স্পেশাল অপারেশন ব্যুরো-৪ এর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়ুন্ট উইন সোয়েকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফোনে মিয়াতকে সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এই তিনজনই সামরিক অভিযানে বেসামরিক গণহত্যা, বিমান হামলা এবং নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।
এছাড়া সাবেক কর্নেল ও বর্তমান প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণমন্ত্রী উ খিন মাউং ইয়িকে জাতীয় পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রস্তাব করা হয়েছে। সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উ অং কিয়াও হো (বর্তমান শ্রমমন্ত্রী)কে প্রেসিডেন্ট কার্যালয় মন্ত্রী এবং সাবেক জেনারেল উ টিন অং সান (বর্তমান প্রেসিডেন্ট কার্যালয় মন্ত্রী)কে পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পরিবহনমন্ত্রী সাবেক জেনারেল মিয়া তুন উ-কে ডিজিটাল উন্নয়ন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রস্তাব করা হয়েছে।

খিন মাউং ই, মিয়া তুন উ এবং টিন অং সান—এই তিনজনও মিয়ানমারের জনগণের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার অভিযোগে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন।
বর্তমান অর্থ ও রাজস্ব এবং বিনিয়োগ ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্কমন্ত্রী ড. কান জ’কে পুনরায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বর্তমান মন্ত্রী নম্বর-৪ উ হতুন ওনকে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে চীন ও উত্তর কোরিয়ায় নিযুক্ত বর্তমান রাষ্ট্রদূত উ টিন মাউং সোয়েকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, যিনি থান সোয়ের স্থলাভিষিক্ত হবেন।
ড. কান জ’ও জান্তার আর্থিক চাহিদা পূরণে ভূমিকার কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং ডিফেন্স সার্ভিস টেকনোলজি একাডেমির রেক্টর ড. মিয়ো থেইন কিয়াওকে তার পদে বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ধর্মবিষয়ক ও সংস্কৃতিমন্ত্রী সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টিন ও লুইনকেও একই দায়িত্বে রাখার কথা বলা হয়েছে।
কৃষি, পশুপালন ও সেচমন্ত্রী এবং জাতীয় পুনর্মিলন ও শান্তি কমিটির সচিব সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিন নাউংকেও তার পদে বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া ইউএসডিপির সহ-সভাপতি সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিয়ো জ’ থেইনকে সমবায় ও গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রী, সাবেক কর্নেল ও ইউএসডিপির জ্যেষ্ঠ নেতা মাউং মিয়িন্টকে হোটেল, পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মাউং মিয়িন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট উ থেইন সেইনের আমলে শিল্পমন্ত্রী ছিলেন।
ইয়াঙ্গুন অঞ্চলে ইউএসডিপির সভাপতি এবং সাবেক ইউনিয়ন মন্ত্রী উ খিন মাউং সোয়েকে শ্রমমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বর্তমান ইউএসডিপি চেয়ারম্যান ও জান্তা-নিয়ন্ত্রিত নিম্নকক্ষের স্পিকার সাবেক পুলিশপ্রধান খিন ইয়ের সঙ্গে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের আগে-পরে সহিংস প্রো-সামরিক সমাবেশ আয়োজন করেছিলেন।
উল্লেখ্য, ওই সমাবেশগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিল তখন, যখন দাও অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে সামরিক সমর্থিত ইউএসডিপিকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে।
মাউং মিয়িন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাগাইং অঞ্চলের মিংগিন টাউনশিপে প্রো-জান্তা ‘পিউ সাও হ্তি’ মিলিশিয়া গঠন ও অস্ত্র সরবরাহে ভূমিকা রাখেন, যারা অভ্যুত্থানের পর গ্রাম লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। অন্যদিকে মিয়ো জ’ থেইন গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জান্তা-আয়োজিত নির্বাচনে ইউএসডিপির প্রার্থী হিসেবে বাগো অঞ্চলের পাউকখাউং টাউনশিপ থেকে জয়ী হন।
প্রস্তাবিত সব মন্ত্রীর নাম আগামী ৯ এপ্রিলের ইউনিয়ন পার্লামেন্ট অধিবেশনে অনুমোদন দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদি কোনো আপত্তি না ওঠে।

এদিকে সোমবার জান্তা-নিয়ন্ত্রিত রাজ্য ও আঞ্চলিক পার্লামেন্টগুলোর অনুমোদনে সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলের প্রধান হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে ASEAN Parliamentarians for Human Rights (এপিএইচআর) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট পদ স্বীকৃতি না দেওয়ার আহ্বান জানায়। তারা জানায়, এটি ছিল জান্তার পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, জান্তা প্রধানের প্রেসিডেন্ট পদকে স্বীকৃতি দিলে সহিংস সামরিক শাসন বৈধতা পাবে, যা ব্যাপক মানবভোগান্তি, সামাজিক বিভাজন এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ক্ষতি ডেকে এনেছে।
জান্তা সরকার থেকে তথাকথিত নির্বাচিত সরকারের দিকে রূপান্তরের এই সময়েও প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা, অভিযান ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রয়েছে। এতে বহু মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
গত ৩ এপ্রিল Amnesty International জানায়, মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট হওয়া তাকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের দায় থেকে রক্ষা করবে না। সংস্থাটির গবেষক জো ফ্রিম্যান বলেন, “সামরিক পোশাক ছেড়ে বেসামরিক পোশাক পরলেই তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ বদলে যায় না।”
প্রসঙ্গত, নতুন মন্ত্রিসভা গঠন ও রাজনৈতিক রূপান্তরের এ প্রক্রিয়াকে ঘিরে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।