ভারতে জ্বালানি সংকটে কোভিডকালের মতো শহর ছাড়ছে হাজারো শ্রমিক

ভারতে জ্বালানি সংকটে কোভিডকালের মতো শহর ছাড়ছে হাজারো শ্রমিক

ভারতে জ্বালানি সংকটে কোভিডকালের মতো শহর ছাড়ছে হাজারো শ্রমিক
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

দিল্লির প্রধান রেলস্টেশনে ভিড় জমাচ্ছেন অভিবাসী শ্রমিকরা। পিঠে বড় আকারের ব্যাগ নিয়ে তারা রাজধানী ছাড়ছেন। কাজের সন্ধানে একসময় এই শহরেই এসেছিলেন তারা।

এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই দিনমজুর ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।

এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ফলে এই শ্রমিকরা এখন নিজেদের গ্রাম বা ছোট শহরগুলোতে ফিরে যাচ্ছেন।

যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন, তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি তারা এখন দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। শহর ছাড়ার এই হিড়িক মূলত সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন।

এই সংকটের মূলে রয়েছে রান্নার গ্যাস। জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।

এর জেরে ভারতে এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। সিলিন্ডার গ্যাস এখন দুষ্প্রাপ্য ও দামি পণ্যে পরিণত হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তবুও হরমুজ প্রণালী বন্ধ রয়েছে এবং বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

গ্যাসের এই তীব্র সংকটের কারণে অনেক ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া ভয়াবহ পরিস্থিতির এটি মাত্র একটি উদাহরণ।

২০ বছর বয়সী রওশন কুমার তার স্ত্রী ও ভাইকে নিয়ে নয়াদিল্লি রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছেন। তারা উত্তর ভারতের লুধিয়ানায় নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাবেন।

কোভিড মহামারির সময়ের মতো চরম দুর্ভোগ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই এই পরিবারটি শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রওশন কুমার (ডানদিকে), ২০, এবং তার ভাই নয়াদিল্লি রেল স্টেশনে। শ্বেতা শর্মা/দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

ব্যাগটি নামিয়ে রওশন বলেন, ‘আমরা ফিরে যাচ্ছি। যখন পেট ভরে খেতেই পারছি না, তখন এখানে থেকে আমাদের কী লাভ?’

রওশন জানান, খোলাবাজারে এখন প্রতি কেজি এলপিজি ভরতে প্রায় ৪০০ রুপি (৩.২০ পাউন্ড) খরচ হচ্ছে, যা স্বাভাবিক দামের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি।

দিনমজুর হিসেবে তিনি দিনে ৪০০ থেকে ৪৫০ রুপি আয় করেন। এর মানে হলো, একটি ৫ কেজির ছোট সিলিন্ডার কিনতেই তার এক সপ্তাহের পুরো আয় চলে যাবে।

তিনি বলেন, ‘আমি কী সঞ্চয় করব আর কীভাবে বেঁচে থাকব? আমার মতো মানুষেরা রোজগার করে বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য বড় শহরে আসে।

এখন মনে হচ্ছে খাওয়ার জন্য আমাকে ভিক্ষা করতে হবে।’

অনেক চেষ্টার পরও খালি সিলিন্ডারে গ্যাস ভরতে ব্যর্থ হন রওশন। পরে সেটি মাত্র ২৫০ রুপিতে (২ পাউন্ড) বিক্রি করে দেন তিনি।

এরপর একটি ব্যাগের ভেতর এক চুলার একটি গ্যাসের স্টোভ, পাইপ এবং কিছু হাঁড়িপাতিল গুছিয়ে নিয়েছেন তিনি।

রওশনের মতো ভারতের শহুরে দরিদ্র মানুষের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের প্রভাব খুব দ্রুত পড়েছে।

ভারত তাদের ব্যবহৃত এলপিজি-র প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানি করে। আর এই আমদানি করা গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে।

পাইপলাইনের মাধ্যমে রান্নার গ্যাসের সুবিধা না থাকায় বেশিরভাগ পরিবারই এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল।

রান্নাঘরের মেঝেতে রাখা এই ধাতব সিলিন্ডারগুলো রাবারের পাইপ দিয়ে চুলার সঙ্গে যুক্ত থাকে। নিবন্ধিত গ্রাহকরা সরকার-অনুমোদিত পরিবেশকদের কাছ থেকে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস পেলেও বাকিদের খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়।

সরবরাহ কমে যাওয়ায় এখন সেখান থেকে গ্যাস সংগ্রহ করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রেলস্টেশনের সিঁড়িতে রওশনের পরিবার থেকে কিছুটা দূরেই স্ত্রী, তিন সন্তান ও ভাইকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন রাম বিলাস যাদব।

তারা পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারের বক্সারগামী ট্রেনের অপেক্ষায় আছেন। ২৫ দিন আগে তাদের ঘরের গ্যাস ফুরিয়ে যায়। এরপর থেকে তারা কাছের একটি খাবারের দোকানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

রওশন কুমার ও তার স্ত্রী দিল্লি ছাড়ার আগে তাদের চুলা গুছিয়ে নিয়েছেন। শ্বেতা শর্মা/দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

যাদব বলেন, ‘শহর ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। জমানো টাকা ভেঙে আর কতদিন হোটেলের খাবার খেতে পারব? স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোও খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।’

সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার জন্য দিনের পর দিন চেষ্টা করেছেন তিনি। ছোট সন্তানকে কোলে নিয়ে যাদব বলেন, ‘আমি লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে প্রায় ভিক্ষা করেছি। কিন্তু কাউকেই কিছু করার অবস্থায় দেখলাম না।’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার স্ত্রী কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেন, ‘কেউ স্বেচ্ছায় শহর ছাড়ে না। পরিস্থিতিই আমাদের ফিরে যেতে বাধ্য করছে। মনে হচ্ছে যেন এই শহর আমাদের নয়।’

একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন নির্মাণ শ্রমিক লাখে চৌহান। টানা দুই সপ্তাহ কাজ না পেয়ে তিনিও বিহারের নিজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন।

দিল্লিতে একটি ছোট দুই কক্ষের বাসায় তিনি তার ছেলে, পুত্রবধূ এবং তাদের দুই সন্তানের সঙ্গে থাকতেন।

তিনি বলেন, ‘এখানকার ঘরগুলো এমনিতেই খুব ছোট। কাঠখড়ি দিয়ে রান্না করার কোনো সুযোগ নেই। অন্তত বিহারে গেলে আমরা চুলায় (মাটির তৈরি সনাতনী চুলা) রান্না করতে পারব।’

চৌহান জানান, কোভিড লকডাউনের পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো তাকে শহর ছাড়তে বাধ্য হতে হচ্ছে। তৃতীয়বার তিনি আবার শহরে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।

তিনি বলেন, ‘এখানে গ্যাস নেই, কাজ নেই এবং কোনো আশাও নেই। আমরা এখানে না খেয়ে মরতে চাই না, কারণ প্রতিদিন বাইরের খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।’

২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী শ্রম মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশের ৫ কোটি ৪০ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখই দিল্লিতে থাকেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

ভারতে দীর্ঘ ১৫ বছর পর এই প্রথমবারের মতো নতুন করে আদমশুমারির কাজ শুরু হয়েছে। আর ঠিক এই সময়েই বহু মানুষ তাড়াহুড়ো করে শহর ছাড়ছেন।

উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের বাসিন্দা ও গৃহকর্মী আশা কুমারী তার গ্যাস সিলিন্ডার প্রায় ফুরিয়ে আসায় বিকল্প উপায় খুঁজছেন।

কোভিড মহামারিতে স্বামীকে হারানো এই নারী একাই দুই সন্তানের ভরনপোষণ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি গ্যাস বাঁচিয়ে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ বর্তমানে তিনি দিনে মাত্র একবার রান্না করছেন জানিয়ে বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমি যেসব বাসায় কাজ করি, সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া খাবার পাই, যা আমাকে সাহায্য করে।’

তিনি জানেন যে এভাবে বেশিদিন চলা সম্ভব নয় এবং সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে গেলে তাকেও শহর ছাড়তে হবে।

তবে ভারত সরকার দাবি করছে, দেশে এলপিজি সরবরাহ স্থিতিশীল ও পর্যাপ্ত রয়েছে এবং কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

আহমেদাবাদের একটি গ্যাস এজেন্সির বাইরে এলপিজি সিলিন্ডার রিফিল করার জন্য লোকজন লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন (রয়টার্স)

গত সোমবার দেশটির পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় জানায়, ১ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৮ কোটি এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বর্তমানে ৯৭ শতাংশ গ্যাস বুকিং অনলাইনে হচ্ছে এবং জালিয়াতি রোধে প্রায় ৯০ শতাংশ সরবরাহ ‘ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড’ বা ওটিপি-র মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।

তবে এই সুবিধাগুলো কেবল বৈধ সংযোগ থাকা গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য, যার জন্য বাসস্থানের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু অভিবাসী শ্রমিকদের কাছে এমন কোনো প্রমাণপত্র থাকে না।

সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার বিষয়টি সরকার সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনগণকে শান্ত থাকার এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের কারণে ‘কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে’।

মোদি কোভিড লকডাউনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘কোভিড মহামারির সময় জাতি যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল, এখনো সেভাবে প্রস্তুত ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কোভিড সংকটের সময় আমরা একইভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলাম। এখন আবার আমাদের সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য অনলাইনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ‘ইন্ডিয়া লকডাউন অ্যাগেইন’ (ভারতে আবার লকডাউন) বিষয়টি শীর্ষ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।

গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পর অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকার একটি স্বস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।

সাধারণ পরিচয়পত্র ব্যবহার করেই তাদের ৫ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও শ্রমিক অধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংকট দেশের কাঠামোগত গভীর ঘাটতিগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

‘ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন কমিটি ফর ইরাডিকেশন অব বন্ডেড লেবার’-এর আহ্বায়ক নির্মল গোরানা এই পরিস্থিতিকে একটি বিপর্যয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তিনি ১৯৭৯ সালের ‘ইন্টারস্টেট মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কমেন অ্যাক্ট’-এর অধীনে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের সঠিকভাবে নিবন্ধিত করতে সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরেন। এই আইনটি মূলত শ্রমিকদের নিয়োগ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘সরকার শ্রমিকদের সঠিক ও নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পারছে না, যা অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি চরম অবিচার। রাষ্ট্র যদি এই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারে, তবে শহরের চাকায় গতি রাখা এই অদৃশ্য শ্রমশক্তির মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় প্রাথমিক পদক্ষেপ হবে।’

যারা বাড়ি ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের শহর ছাড়ার এই ঢল সামাল দিতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গোরানা।

তিনি বলেন, ‘বিভ্রান্তি এড়াতে কাউন্সেলিং, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জনসম্মুখে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া উচিত। এই মুহূর্তে মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, আর আতঙ্কিত হওয়াটা এখানে অবধারিত। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক।’

-টিবিএস।