গ্রাহকের তথ্য জান্তার হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে টেলিনরের বিরুদ্ধে নরওয়েতে মামলা
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সামরিক জান্তার হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে নরওয়ের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেলিনরের বিরুদ্ধে দেওয়ানি শ্রেণি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সুইডেনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা Justice and Accountability Initiative (জেএআই) বুধবার এ মামলা করে।
মামলাটিকে সমর্থন দিচ্ছে Open Society Justice Initiative (ওএসজেআই)। সংস্থাটি জানিয়েছে, নরওয়েতে দায়ের করা এই মামলার মাধ্যমে এমন একটি শাসনের কাছে কর্মী ও নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের জন্য করপোরেট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যারা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের এক বছর পর, ২০২২ সালের মার্চে টেলিনর তাদের মিয়ানমার শাখা বিক্রি করে দেয়। এটি হস্তান্তর করা হয় ইনভেস্টকম পিটিই লিমিটেডের কাছে, যা লেবাননের এম১ গ্রুপ এবং মিয়ানমারের শ্বে ব্যাইং ফিউ (এসবিপি) কোম্পানির যৌথ উদ্যোগ। এসবিপি’র মালিক জান্তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী থেইন উইন জাও।
জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং-এর কন্যা খিন থিরি থেট মোন এসবিপিতে অংশীদার। বর্তমানে ‘এটম’ নামে টেলিনরের সাবেক কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এই প্রতিষ্ঠান।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অভ্যুত্থানের পর টেলিনর ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে, যা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনে সহায়তা করেছে।
বাদীপক্ষের দাবি, এসব তথ্যের মধ্যে ছিল কল লগ ও অবস্থান তথ্য, নাম-ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, এমনকি মোবাইল নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত ফেসবুক ও ব্যাংক হিসাবের তথ্যও।
এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে জান্তা সরকার বিরোধী সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যার ফলে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাদীপক্ষ জানায়, টেলিনর মিয়ানমার অন্তত ১,২৫৩টি ফোন নম্বরের তথ্য জান্তার কাছে সরবরাহ করেছে, যদিও তাদের নিজস্ব মূল্যায়নেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল।
এই মামলায় প্রতি গ্রাহকের জন্য ৯ হাজার ইউরো (প্রায় ১০,৫০০ মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।
জেএআই-এর চেয়ারম্যান কো ইয়ে বলেন, “আমরা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজনের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে টেলিনরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে চাই। এ কারণেই আমরা এই মামলা করছি।”
অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন জনপ্রিয় র্যাপার ও সংসদ সদস্য Phyo Zeyar Thaw-এর স্ত্রী থা জিন এবং গণতন্ত্রপন্থী কর্মী আং থু। ফিও জেয়ার থাওকে ২০২২ সালে জান্তা ফাঁসি দেয়।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর টেলিনর মিয়ানমার ফিও জেয়ার থাওয়ের ফোনের তথ্য জান্তার কাছে সরবরাহ করে, যা মূল কোম্পানির জ্ঞাতসারে করা হয়। এর কিছুদিন পরই তাকে ইয়াঙ্গুনে গ্রেপ্তার করা হয়, পরে গোপন বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০২২ সালের জুলাইয়ে আরও তিনজন গণতন্ত্রপন্থী কর্মীর সঙ্গে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
ফিও জেয়ার থাওয়ের স্ত্রী থা জিন বলেন, “আমি শুধু আমার স্বামীকে হারাইনি, এটি গণতন্ত্রের জন্যও বড় ক্ষতি। তিনি ছিলেন একজন যুবনেতা এবং গণতন্ত্রের প্রতি নিবেদিত।”
অন্যদিকে কর্মী আং থু জানান, ২০২১ সালের অক্টোবরে মুক্তির প্রাক্কালে কারাগারের গেট থেকেই তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়, যখন টেলিনর তার তথ্য সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং দুই-তৃতীয়াংশ সাজা ভোগের পর গত বছর মুক্তি পান।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জান ম্যাগনে ল্যাংসেথ বলেন, “নরওয়ের টেলিনর স্পষ্টভাবে ব্যবহারকারীর তথ্য হস্তান্তরে ভূমিকা রেখেছে, যদিও এতে গ্রাহকদের ঝুঁকি ছিল। আমাদের কাছে এমন প্রমাণ আছে, যেখানে মূল কার্যালয়ের কর্মকর্তারাই এই তথ্য দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।”
এদিকে Justice for Myanmar (জেএফএম) এবং International Commission of Jurists Norway (আইসিজে নরওয়ে) টেলিনর গ্রুপ ও তাদের সাবেক মিয়ানমার ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আলাদা ফৌজদারি মামলাও করেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তারা রাষ্ট্রীয় নজরদারি সরঞ্জাম স্থাপন করে নরওয়ের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে, যা পরে জান্তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
একই সঙ্গে নরওয়ের পার্লামেন্টও তদন্ত শুরু করেছে—অভিযোগ রয়েছে, দেশটি ছাড়ার সময় টেলিনর শত শত মিয়ানমার বিরোধী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও আটক হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছিল।
প্রসঙ্গত, এই মামলা মিয়ানমারে সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক করপোরেট দায়িত্ব ও মানবাধিকার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।